আফগানিস্তানের কাবুল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে চলতি মাসে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান যোদ্ধারা কাবুল দখল করার পর মার্কিন বাহিনী দেশটি ছাড়তে শুরু করলে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তানে ন্যাটো-সমর্থিত ওই মার্কিন আগ্রাসন ও দখলদারত্বের পথচলা শুরু হয়। এখন সেই অভিযানকে এক ধরনের ব্যর্থতা বলেই বিবেচনা করা হয়। এতে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মার্কিন ও ৪৫০ জন ব্রিটিশ সেনার প্রাণহানি ঘটে। দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়—যাঁদের সঠিক সংখ্যা আজও অজানা।

আল-কায়েদার সদস্যদের পরাস্ত করা গেলেও ২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং দমন–পীড়নমূলক শাসন জারি করে। আফগানিস্তানে রাষ্ট্র গঠনের ব্যর্থতা এবং পশ্চিমের অবিবেচনাপ্রসূত হস্তক্ষেপ—এ দুইয়ের এক চরম উদাহরণ হিসেবে দেশটিকে বারবার উল্লেখ করা হয়। এ অভিযাত্রা ছিল ‘চিরন্তন যুদ্ধের’ (ফরএভার ওয়ার) এক আদর্শ নমুনা; যে শব্দবন্ধটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে।

এই ঘটনার তাৎপর্য যদি স্থায়ী কিছু হয়ে থাকে, তা মূলত রাজনীতিবিদ ও জেনারেলদের জন্য সতর্কতা হিসেবেই ধরা হয়—ন্যায্য কারণ, সুনির্দিষ্ট ও অর্জন করা যায় এমন লক্ষ্য এবং বেরিয়ে আসার কৌশল (এক্সিট স্ট্র্যাটেজি) ছাড়া যেন কোনো সীমাহীন সংঘাতে টেনে নেওয়া না হয়। হতাশাজনক বিষয় হলো, চিরন্তন যুদ্ধের শিক্ষা ইরাকের ক্ষেত্রেও আবার নতুন করে নেওয়া লাগে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সেখানে আগ্রাসন চালায় এবং সামান্য লাভের আশায় ব্যাপক ক্ষতি করে; ২০১১ সালে তারা সেখান থেকে বিদায় নেয়।

‘আর কখনোই নয়!’—সেই সময় এবং তার পর থেকে আবেগপূর্ণ দাবি ছিল এটাই। তবু মনে হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলা করার মতো চরম বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্তের পর একই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তিনি যে যুদ্ধকে নিছক ‘ছোটখাটো অভিযান’ বলেছিলেন, সেটি দেখতে দেখতে ষষ্ঠ মাসে গড়াচ্ছে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই যুদ্ধের গতি ও রূপ দেখেও মনে করা হচ্ছে, এটি ‘চিরন্তন যুদ্ধের’ দিকেই এগোচ্ছে।

সব যৌক্তিকতা যেন অকার্যকর হয়ে পড়ে—সেই দুঃস্বপ্ন আবার ফিরে এসেছে। কেন এমনটা হতে পারে? যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণগুলো একপাশে রেখে উত্তর খোঁজা হচ্ছে বাইরের হুমকির পরিধি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক অতিরঞ্জন ও ভুল ধারণার ভেতরে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অসততা, অতি আত্মবিশ্বাস, বিচারবুদ্ধির অভাব এবং ভুল নেতৃত্বের ওপর আস্থার বিষয়গুলো।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক কার্টার মালকাসিয়ান। আফগানিস্তানের হেলমান্দ ও কাবুলে তিনি মার্কিন বাহিনীর বেসামরিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি মনে করেন, আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে সেনা রাখার মূল যুক্তিটিই ছিল মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। ধারণা করা হয়েছিল, (সেনা না রাখলে) দেশটি আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে।

মালকাসিয়ান লিখেছেন, ‘এমন কিছুই ঘটেনি। গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটিও সন্ত্রাসী হামলা চালায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলার ব্যয় করেছে। ৭ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল...এগুলোর সবই ছিল এমন এক হুমকি থেকে আত্মরক্ষার নামে, যা পরবর্তী সময়ে অতিরঞ্জিত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।’

‘পাঁচ বছর পর সবচেয়ে বড় বিপদ এটি নয় যে আফগানিস্তানে আবারও সন্ত্রাসীদের কোনো নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠতে পারে। বরং এর চেয়ে গুরুতর হুমকি হলো বিষয়টি সামষ্টিকভাবে ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি।’ সংক্ষেপে, তাত্ক্ষণিক ভয়ভীতি যেন যেন সেই সীমাহীন চিরন্তন যুদ্ধের ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি—মানবিক, আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক—ক্ষতির স্মৃতির ওপর ছায়া ফেলতে না পারে, এমন বক্তব্যও উঠে এসেছে।

আফগান যুদ্ধ যদি একটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে চালিয়ে যাওয়ার মতোই পরিণতি ডেকে আনে, তবে তেলসমৃদ্ধ ইরাকে আগ্রাসনের ক্ষেত্রটিও আরও বেশি ভ্রান্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের সরকারের কাছে রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে এবং তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। পরে ওই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির সে দাবিও পরে একইভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয় যে ইরাক আল-কায়েদাকে ‘সহায়তা ও সুরক্ষা’ দিচ্ছে।

ফলে আগ্রাসন এবং তার পাল্টায় সহিংসতা আরও বড় একটি অন্তহীন যুদ্ধের অংশ হয়ে ওঠে। এটি ছিল বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ’। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে নাইন-ইলেভেন–পরবর্তী সহিংসতায় আনুমানিক ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নাইন-ইলেভেন–পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে মারা গেছেন প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ।

ভয়াবহ ঘটনার চাপে পড়ে যুদ্ধ ও শান্তির মতো বিষয়গুলোতে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে সমালোচনা করা সহজ হলেও, রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য হাসিলের অসৎ চেষ্টা, এবং গোয়েন্দা তথ্য ও জনমতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের বিষয়টি ক্ষমা করা কঠিন বলে মনে করা হয়। তবে প্রশ্ন থাকে—কোনো গোপন উদ্দেশ্য ছাড়া কি কখনো কোনো যুদ্ধ শুরু হয়েছে?

হোমারের মহাকাব্য ‘অডিসি’ অবলম্বনে নির্মিত বহুল আলোচিত নতুন চলচ্চিত্রে ১০ বছর ধরে চলা ট্রোজান যুদ্ধের পরবর্তী পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে স্পার্টার সুন্দরী হেলেনকে অপহরণের জেরেই এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। তবে সোজাসাপটা বললে, যুদ্ধটি একজন সুন্দরী নারীর চেয়ে হয়তো অবাধ বাণিজ্যের অধিকার নিয়েই বেশি ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল, তারা গণতন্ত্রকে সমর্থন করা এবং কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানোর লক্ষ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধ করেছিল—যা মূলত ‘ডমিনো তত্ত্ব’ নামে পরিচিত একটি অকার্যকর ধারণা। তবে এ যুদ্ধ যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মানসিকতা এবং বৈশ্বিক কর্তৃত্ববাদের লড়াইও ছিল, তা অনেকটা নিশ্চিত বলেও বলা হচ্ছে। সেই অর্থে, আজও তেমন কিছুই বদলায়নি বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়।

এর বাইরে কোন বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিবিদদের এমন সব বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর মতো বড় ঝুঁকিতে ফেলে—যে যুদ্ধগুলোর ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং যার পরিণতি সাধারণত পরাজয়ই হয়? নিরাপত্তাহীনতা, সহজ কথায় ‘ভীতি’—এখানে সাধারণ নিয়ামক। সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের মতোই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জেনেশুনেই ইরান–সম্পর্কিত হুমকিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করেছেন।

২০০৩ সালের ইরাকের মতোই ইরানেরও কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই; এমনকি দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে চাইছে বা সম্প্রতি এমন চেষ্টা করেছে—এমন কোনো শক্ত প্রমাণও নেই। আর এখানেই রয়েছে বৈপরীত্যের পুনরাবৃত্তি: এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির আবারও ভয় পেয়ে ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মেতে ওঠারই দৃশ্যপট।

ভেনেজুয়েলা, কিউবা, কলম্বিয়া, পানামা ও গ্রিনল্যান্ডের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিবেশীদের প্রতি ট্রাম্পের এই চরম বৈরী আচরণের পেছনে এক চিরস্থায়ী প্রেক্ষাপট রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এর শিকড় রয়েছে সেই প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর—পশ্চিম গোলার্ধের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর এক অনন্য মিশন ও অধিকার একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে। পরে তারা এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পুরো বিশ্বকে দেখছে।

একইভাবে লোভও চিরস্থায়ী বলে ধরা হয়। গণতন্ত্র প্রসারের পরোপকারী আদর্শ বাদ দিয়ে ট্রাম্প এখন অর্থনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক আধিপত্যেরও বিস্তার করতে চাইছেন। তিনি ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ থেকে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। হরমুজ প্রণালির ওপর তাঁর মনোযোগ দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে ঘিরে কীভাবে নিরাপত্তানীতি নির্ধারিত হয়।

মতামতটি লিখেছেন দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিবিষয়ক ধারাভাষ্যকার সাইমন টিসডাল।