যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি নতুন পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও উপত্যাকাটিতে রক্তপাত থামাচ্ছেই না ইসরায়েল। গাজাজুড়ে দফায় দফায় চালানো সামরিক হামলায় এক দিনেই শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

রোববার (২ আগস্ট) গাজার স্থাস্থ্য বিভাগ সূত্রে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। এদিন ভোর থেকে শুরু হওয়া এই হামলাকে গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে ফিলিস্তিনি চিকিৎসকরা।

আল-শিফা হাসপাতালের দেওয়া তথ্যমতে, পশ্চিম গাজা শহরের আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী শিশুসন্তান আজ্জাম।

খান ইউনিসের উত্তর-পশ্চিমে আল-কারারা এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। তারা হলেন মাহমুদ (৩৮), তার স্ত্রী ফাতিমা (৩৭) ও তাদের ছোট মেয়ে । নাসের হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় পরিবারের আরও তিনজন গুরুতর আহত হন।

এছাড়া মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর কাছে একটি বাড়িতে পৃথক হামলায় কামু আবু মুয়াইলিক (৬৮) ও তার স্ত্রী হুদা (৫৯) নিহত হন। একই অঞ্চলে মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে দুই ভাই ও উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ড্রোন হামলায় আরও এক ফিলিস্তিনি নিহত হন।

পরবর্তীতে গাজা শহরের পশ্চিমে রেমাল মহল্লায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে ও একটি চলন্ত গাড়িতে ড্রোন হামলায় শিশুসহ আরও ছয় ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।

‘ওষুধ ধ্বংস করে অসুস্থতাকেই যুদ্ধের হাতিয়ার বানাচ্ছে ইসরায়েল’

এর আগে শনিবার দেইর আল-বালাহতে অবস্থিত আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের সংলগ্ন কেন্দ্রীয় ওষুধের গুদামগুলোতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।

গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুর্শ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, চিকিৎসা সরবরাহ ধ্বংস করে মূলত ওষুধ ও অসুস্থতাকেই যুদ্ধের হাতিয়ার বানিয়েছে ইসরায়েল। হামলায় দুটি গুদাম সম্পূর্ণ ধ্বংস ও দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আলজাজিরার সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য মাত্র ১৫ মিনিটের এক তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেয় ইসরায়েলি সেনা। এরপরই এই বিকট বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যা আশপাশের অস্থায়ী তাঁবুগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং নতুন করে মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে।

গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও শান্তি-পিস বোর্ড গাজা ‘যুদ্ধবিরতির’ পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের চুক্তি ঘোষণা করলেও বাস্তবে কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে গাজার আবাসিক ভবনগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

কাগজ-কলমের ‘ভ্রান্ত চুক্তি’

ফিলিস্তিনিদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত এসব যুদ্ধবিরতি এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ এবং এটিকে একটি ‘বিভ্রম’ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না।

কাতার, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় অন্তত ১২ হাজার ২২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন।

শিক্ষাবিদ ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের গবেষক মোহানাদ মুস্তফার বলেন, ‘এই চুক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চাপে বাধ্য হয়ে মেনে নিলেও ইসরায়েল নিজের মতো করে চুক্তির ধারাগুলোর বিতর্কিত ব্যাখ্যা দেয়। পরবর্তীতে তারা সেই মনগড়া ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে অব্যাহতভাবে চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন যদি ইসরায়েলের ওপর প্রকৃত ও সরাসরি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করে, তবে এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি মাঠপর্যায়ে কোনো টেকসই শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে না।