সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ভয়াবহ তুষারঝড়ের প্রভাবে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কে২। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৮ হাজার ৬১১ মিটার। উচ্চতার দিক থেকে হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে সামান্য কম হলেও, পর্বতারোহীদের কাছে এটি এক 'ঘাতক পর্বত' হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত এই পিরামিড আকৃতির পর্বতটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অভিযাত্রীদের চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখানে যেমন একে অপরের জন্য জীবন উৎসর্গ করার অনন্য নজির রয়েছে, তেমনি বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জন্ম নিয়েছে চিরন্তন বিরোধও।
প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি কারাকোরাম পর্বতমালা। এর বালতোরো-মুজতাঘ উপশ্রেণিতেই অবস্থিত কে২, যার উচ্চতা ৮ দশমিক ৬ কিলোমিটারের বেশি। কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে এই প্রকাণ্ড পিরামিড আকৃতির পর্বতটি গঠিত হয়েছে। প্রাচীনকালে গন্ডোয়ানাল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতীয় প্লেটটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং একপর্যায়ে এশীয় প্লেটের সঙ্গে এর প্রলয়ংকরী সংঘর্ষ ঘটে। প্লেট টেকটোনিকসের নিয়মে এই স্থানটি একটি সাবডাকশন অঞ্চলে পরিণত হয়, যেখানে ভারতীয় প্লেটটি এশীয় প্লেটের নিচে দেবে যেতে থাকে। এই প্রবল চাপের ফলে ভূত্বক পুরু হয়ে ওপরের দিকে উপচে ওঠে, যার ফলে সৃষ্টি হয় হিমালয় ও কারাকোরাম পর্বতমালা।
এই অঞ্চলেই রয়েছে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিখ্যাত কারাকোরাম ফল্ট, যা একটি স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্ট। কে২-এর বর্তমান রূপ গঠনে হিমবাহ বা গ্লেসিয়ারের ভূমিকা অপরিসীম। এখানে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘতম পর্বত হিমবাহ বালতোরো। এই হিমবাহের ক্রমাগত প্রবাহ পর্বতের শরীরকে খোদাই করে ইউ আকৃতির বিশালাকার উপত্যকা এবং খাড়া ঢাল তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা মিক কনেফ্রি তাঁর ‘দ্য গোস্টস অব কে২: দ্য এপিক সাগা অব দ্য ফার্স্ট অ্যাসেন্ট’ বইয়ে কে২ জয়ের প্রাথমিক ইতিহাস ও অভিযাত্রীদের নানা তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, অধিকাংশ পর্বতের সুন্দর নাম থাকলেও কে২ নামটি এসেছে ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ জরিপ কর্মকর্তা টি জি মন্টগোমারির দেওয়া একটি কোড থেকে। কারাকোরাম পর্বতমালার অবস্থানের কারণে এর নাম রাখা হয় কে২। অত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এর কোনো স্থানীয় একক নাম গড়ে ওঠেনি।
কাঠামোগতভাবে কে২ এভারেস্টের চেয়ে অনেক বেশি খাড়া ও বিপজ্জনক। মার্কিন পর্বতারোহী জর্জ বেল ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হয়ে ফিরে এসে লিখেছিলেন, "এটি একটি ঘাতক পর্বত যা আপনাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে।"
২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় সামান্য কিছু সমতল জায়গা ছাড়া পুরো পর্বতটি অত্যন্ত খাড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাথর ও বরফধস এবং চরম অনিশ্চিত আবহাওয়া। ২০০৮ সালে কে২ জয়ের চেষ্টায় মাত্র এক দিনেই ১১ জন পর্বতারোহী প্রাণ হারান।
কে২ জয়ের প্রথম দিকের অভিযানগুলো ছিল বেশ অদ্ভুত। ১৯০২ সালে পশ্চিমাদের হয়ে প্রথম উদ্যোগ নেন অ্যালিস্টার ক্রাউলি ও অস্কার একেনস্টাইন। তবে ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান হিসেবে পরিচিত ক্রাউলি অভিযানে গিয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তীব্র জ্বরের ঘোরে তিনি তাঁবুর ভেতর রিভলবার উঁচিয়ে সহযাত্রীদের ভয় দেখাতে শুরু করেন, যার ফলে প্রথম অভিযানটি ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে মার্কিন পর্বতারোহী চার্লি হিউস্টনের নেতৃত্বে এক অনন্য ইতিহাস রচিত হয়। তিনি পর্বতারোহীদের আত্মত্যাগের বন্ধনকে বলতেন "ব্রাদারহুড অব দ্য রোপ"। সহযাত্রী ক্রেইগ ম্যাকক্লেনহানকে অসুস্থ অবস্থায় বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিলেন, যা কে২-এর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
অন্যদিকে, ১৯৩৯ সালে ফ্রেডরিখ ভাইসনারের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানটি মানুষের চরম স্বার্থপরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। চূড়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেও তাঁকে নিচে নেমে আসতে হয়। ব্যাক-ক্যাম্পে ফিরে তিনি দেখেন, দলের নতুন সদস্যরা ভয়ে তড়িঘড়ি নিচে নেমে যাওয়ার সময় মাঝপথের তাঁবু, ঘুমানোর ব্যাগ ও রসদপত্র সব নষ্ট করে দিয়ে গেছে। এই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে উঁচুতে আটকে পড়া অভিযাত্রী ডাডলি উলফ এবং তাঁকে উদ্ধারে যাওয়া তিন শেরপা পর্বতেই করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়।