দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টি ও তীব্র খরার প্রভাবে দানিউব নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নিজেদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাঙ্গেরি। রিয়্যাক্টর ঠান্ডা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব দেখা দেওয়ায় দেশটির সরকারকে এই পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। রোববার (২ আগস্ট) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ার জানিয়েছেন, মধ্য হাঙ্গেরিতে অবস্থিত ‘পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’ রোববার বন্ধ করে দেওয়া হবে। উল্লেখ্য, এই কেন্দ্রটি থেকেই দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করা হয়। গত ৪৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কেন্দ্রটিতে পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন বা উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধের ঘটনা ঘটল।

প্রধানমন্ত্রী মাগিয়ার জানান, কেন্দ্রটির স্বাভাবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার মেগাওয়াট। তবে পানির সংকটে গত শুক্রবার এর উৎপাদন কমে ৯৬৫ মেগাওয়াটে দাঁড়ায় এবং রাতারাতি তা আরও হ্রাস পেয়ে মাত্র ২৪০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

রাজধানী বুদাপেস্টের দক্ষিণে অবস্থিত সোভিয়েত নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে চারটি রিয়্যাক্টর রয়েছে, যা ঠান্ডা রাখতে দানিউব নদী থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় পাম্পগুলোর মাধ্যমে পর্যাপ্ত পানি টানা সম্ভব হচ্ছে না। পাকস পয়েন্টে নদীর পানি সীমা মাইনাস ১৩৪ সেন্টিমিটারে পৌঁছালেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, পানির স্তর আরও কমে মাইনাস ১৪৪ সেন্টিমিটারে নেমে যেতে পারে। এর আগে ২০১৮ সালে নদীতে সর্বনিম্ন মাইনাস ৯৮ সেন্টিমিটার পানির রেকর্ড ছিল, যা এবার ছাড়িয়ে গেছে।

জার্মানি থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইউরোপের অন্যতম প্রধান নদী দানিউব। গত কয়েক মাসের টানা তাপদাহ ও খরার প্রভাবে দানিউবসহ ইউরোপের আরও অনেক নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। তীব্র পানি সংকটের কারণে হাঙ্গেরি ইতোমধ্যে দেশটির ১০০টিরও বেশি শহর ও গ্রামে পানি ব্যবহারের ওপর নানা বিধিনিষেধ জারি করেছে। এছাড়া যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন প্রচুর পানি ব্যবহার করে, তাদের সাময়িকভাবে পানি ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

জলবায়ুর এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির ফলে দেশটির নৌপরিবহন, পর্যটন, কৃষি এবং শিল্পখাতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া হাঙ্গেরির জন্য এই খরা নতুন এক আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এদিকে প্রতিবেশি দেশ স্লোভাকিয়া এই সংকটকালে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো জানিয়েছেন, তারা আঞ্চলিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং হাঙ্গেরিকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ-সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ইউরোপজুড়ে এমন অভূতপূর্ব তাপমাত্রা ও খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের মে মাস থেকে ইউরোপে দফায় দফায় তাপদাহ চলছে, যার মধ্যে গত জুন মাসটি ছিল মহাদেশটির ইতিহাসে উষ্ণতম মাস।