গাজায় চলমান সামরিক অভিযান ও গণহত্যার অভিযোগ আড়াল করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সিস্টেমগুলোকে বিভ্রান্ত করার জন্য কোটি কোটি ডলারের এক গোপন মিশন চালিয়েছে ইসরায়েল সরকার। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড এবং পারপ্লেক্সিটির মতো জনপ্রিয় এআই প্ল্যাটফর্মগুলোতে গাজা যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে যেন ইসরায়েলপন্থী তথ্য প্রদর্শিত হয়, সেই লক্ষ্যেই এই ডিজিটাল প্রভাব বিস্তারের প্রচারণা চালানো হয়েছে।

জর্ডানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়া নিউজ, ড্রপ সাইট নিউজের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ব্র্যাড পারস্কেল এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’-এর সঙ্গে ৪ কোটি ৬৫ লাখ (৪৬.৫ মিলিয়ন) ডলারের একটি চুক্তি করা হয়। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচারণামূলক ওয়েবসাইটের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যার মাধ্যমে এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্তর নিজেদের অনুকূলে আনা সম্ভব হবে।

ড্রপ সাইটের নথিপত্র অনুযায়ী, ক্লক টাওয়ার এক্স গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে শত শত নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। সার্চ ইঞ্জিন এবং এআই ট্রেনিং ডেটাসেটের উপযোগী কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলগুলোর উত্তর পরিবর্তন করাই ছিল এই প্রচারণার লক্ষ্য। প্রযুক্তির ভাষায় এই কৌশলটি ‘এলএলএম পয়জনিং’ বা এআই ডাটা বিষাক্তকরণ হিসেবে পরিচিত। এই ওয়েবসাইটগুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য নয়, বরং সার্চ ইঞ্জিনে স্থান করে নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যাতে এআই সিস্টেমগুলো সহজেই সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

তদন্তে উঠে আসা ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যালাইভিয়া ডট অর্গ, ফ্যাক্টসিগন্যাল ডট অর্গ এবং প্যাক্সপয়েন্ট ডট অর্গ। এসব সাইটে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতার পক্ষে যুক্তি দেওয়া, গাজায় ইসরায়েলি পদক্ষেপের সাফাই গাওয়া এবং গণহত্যার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে ইসরায়েলপন্থী মতামত প্রচার করা হয়েছে।

ড্রপ সাইট জানিয়েছে, বেশ কিছু এআই সিস্টেম ইতিমধ্যে এই ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য ব্যবহার শুরু করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে ‘পারপ্লেক্সিটি’ নামক এআই প্ল্যাটফর্মটি ফ্যাক্টসিগন্যাল ডট অর্গ-এর লিংক উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি মাইক্রোসফটের ‘কপিলট’-ও ক্লক টাওয়ার এক্স-এর সঙ্গে যুক্ত ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য উদ্ধৃত করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই নেটওয়ার্কের কন্টেন্টগুলো ‘কমন ক্রল’-এর মাধ্যমে এআই ট্রেনিং ডেটাসেটে প্রবেশ করেছে। কমন ক্রল হলো একটি বহুল ব্যবহৃত ওয়েব আর্কাইভ, যা লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণের জন্য ডাটা সরবরাহ করে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, ক্লক টাওয়ার এক্স-এর সঙ্গে যুক্ত ১০টি ওয়েবসাইট ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে শত শত বার ক্রল বা স্ক্যান করা হয়েছে, যা এআই-উৎপাদিত উত্তরে এই সাইটগুলোর তথ্য আসার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ডিজিটাল অপতথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেক ফার্স্ট’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হার্ভে লেটোকাক্স জানান, এআই প্রশিক্ষণে কমন ক্রল-এর ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এটি চ্যাটবটের উত্তর প্রভাবিত করার একটি প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

লেটোকাক্স বলেন, “এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণের জন্য ডাটা সায়েন্সের দুনিয়ায় কমন ক্রল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হলো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের সুবিধার্থে উত্তরগুলো ম্যানিপুলেট বা পরিবর্তন করতে চায়।”

ওয়েবসাইটগুলো পর্যালোচনা করে তিনি আরও বলেন, সেগুলোর সহনশীল সুর, সুগঠিত বিন্যাস এবং উদ্ধৃত সূত্রের ওপর নির্ভরতা কন্টেন্টগুলোকে কার্যকর করে তুলতে পারে। কারণ এআই চ্যাটবটগুলো বিতর্কিত বিষয়ে সাধারণত একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। গাজায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকে অতীতে ইসরায়েলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।