ভৌগোলিক সীমারেখার শর্ত পূরণ না করায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান-এর সদস্য হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না বাংলাদেশ। একই কারণে জোটটিতে যুক্ত হতে পারছে না ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ পাপুয়া নিউ গিনিও।
ইন্দোনেশিয়া ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম জাকার্তা গ্লোব-এ প্রকাশিত গত শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি আসিয়ান মহাসচিব নিশ্চিত করেছেন, আসিয়ানে জোটভুক্ত হওয়ার মূল শর্ত হলো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, যা বাংলাদেশ বা পাপুয়া নিউ গিনির নেই।
বাংলাদেশ ও পাপুয়া নিউ গিনি—দুই দেশই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সদস্য হতে দীর্ঘদিন ধরে জোর কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জোটটিতে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তারা ধারাবাহিকভাবে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি পাপুয়া নিউ গিনিকে সদস্য করার বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার জোরালো সমর্থনও ছিল।
তবে আসিয়ান মহাসচিব কাও কিম হর্ন সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন, পূর্ব তিমুরই (তিমোর-লেস্তে) হচ্ছে শেষ দেশ, যাকে এই জোটে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ১০ম আসিয়ান মিডিয়া ফোরামে কাও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমাদের জোট সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয়েছে।’
আসিয়ানের ভৌগোলিক বিধিমালার কথা উল্লেখ করে কাও বলেন, ‘আসিয়ান সনদের ওপর ভিত্তি করে কেবল ১১টি দেশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যস এটুকুই। পাপুয়া নিউ গিনি এবং বাংলাদেশ এই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থিত।’
মূলত ‘আসিয়ান সনদ’ হলো এই জোটের প্রধান আইনি ভিত্তি ও পরিচালিকা নীতি। এই মূল দলিলে নতুন সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা শর্ত নির্ধারণ করা রয়েছে। যার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো—প্রার্থী দেশটিকে অবশ্যই ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বীকৃত ভৌগোলিক অঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত হতে হবে’।
কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পাপুয়া নিউ গিনি ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ, অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়।
তাই বর্তমান নিয়মে ঢাকা এবং পোর্ট মোর্সবির আসিয়ানে যুক্ত হওয়ার একমাত্র পথ হলো—যদি এই জোট তাদের মূল সনদ সংশোধন করে ভৌগোলিক সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করে। তবে সনদে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য জোটের সব সদস্য দেশের সর্বসম্মত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
এ প্রসঙ্গে আসিয়ান মহাসচিব কাও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের সংবিধান বা সনদ সংশোধন করে ভূগোলের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ না করে, তবে এই ১১টি দেশ নিয়েই গঠিত থাকবে আমাদের আসিয়ান।’
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় চেষ্টার পর গত বছর আসিয়ানের ১১তম সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে সক্ষম হয় পূর্ব তিমুর। ২০১১ সাল থেকে তারা জোটের দ্বারে কড়া নাড়ছিল। সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়াটি এতটাই দীর্ঘ ও কঠিন ছিল যে, দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস-হোর্তা একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আসিয়ানের দরজায় জায়গা পাওয়ার চেয়ে স্বর্গে প্রবেশ করা হয়তো সহজ!’
এদিকে বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য হতে দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে আসছে। গত বছর মালয়েশিয়া যখন জোটের সভাপতির দায়িত্বে ছিল, তখন কুয়ালালামপুরের সমর্থন পাওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছিল ঢাকা। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো পাপুয়া নিউ গিনিকে সদস্য করার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছিলেন।
২০২৫ সালে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আসিয়ান সম্মেলনে প্রাবোও বলেছিলেন, ‘আমাদের নিকট প্রতিবেশী পাপুয়া নিউ গিনিকে এই জোটে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছি। তারা আসিয়ানে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’
সেই সঙ্গে ভৌগোলিক রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আসিয়ান যত বেশি শক্তিশালী ও একতাবদ্ধ হবে, বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর দরবারে আমাদের কণ্ঠস্বর তত বেশি জোরালোভাবে শোনা যাবে।’
পাপুয়া নিউ গিনি ১৯৭৬ সাল থেকেই আসিয়ানের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিকে আসিয়ানের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় দেশটি। তবে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পাওয়ার পথ আপাতত তাদের জন্য বন্ধই রয়ে গেল।