উত্তর আফ্রিকার উপকূলে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড সেউতায় মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসীর গণ-অনুপ্রবেশের ঘটনায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সীমান্ত পার হয়ে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং মরক্কো অংশে আরও হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্পেন সরকার দাবি করেছে, স্থল ও পানিপথে সীমান্ত পার হওয়া মানুষের বেশির ভাগই এখন স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যেতে শুরু করেছেন।

স্পেন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, মরক্কো ও সেউতার মধ্যবর্তী সীমানাপ্রাচীর এবং উপকূল রক্ষা বাঁধ টপকানোর চেষ্টাকালে ডুবে গিয়ে এবং পিষ্ট হয়ে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করলে সীমান্তে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এসময় কিছু বাস ও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সীমান্তে স্পেনের সামরিক যান মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবার ও আশ্রয়ের সংকটে অনেক অভিবাসী নিজ থেকেই মরক্কোয় ফিরছেন।

এই আকস্মিক গণ-অনুপ্রবেশ ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সেউতা পরিদর্শন করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে ‘স্পেনের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলো স্পেনের শিথিল অভিবাসন নীতি ও সাম্প্রতিক সাধারণ ক্ষমাকে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে দায়ী করছে।

সংকটের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, ইতালি স্পেনের সঙ্গে সীমান্তহীন ‘শেনজেন’ চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। মাদ্রিদ এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনি লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্পেনের অভিবাসননীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কোর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য এবং ২৫ শতাংশের বেশি তরুণের বেকারত্ব মানুষকে দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব। চলতি জুলাইয়ে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় নিয়ে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে, সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের আর তাত্ক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। এই তথ্যের প্রভাবেই বহু তরুণ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেন। তবে স্পেন সরকার স্পষ্ট করেছে, আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিধান বহাল রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধারণা করা হচ্ছে, রাবাত আলজেরিয়া ও পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেনের কিছু পদক্ষেপে অসন্তুষ্ট হয়ে সীমান্ত শিথিল করে থাকতে পারে। উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের মালিকানাধীন সেউতা ও মেলিইয়া অঞ্চল দুটিকে মরক্কো ‘দখল করা ভূখণ্ড’ হিসেবে গণ্য করে। যদিও মরক্কো ও স্পেনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে স্প্যানিশ পুলিশ মরক্কো সীমান্তে ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি ভাসমান বেড়া (ফ্লোটিং ব্যারিয়ার) স্থাপন শুরু করেছে। তারাজাল এলাকায় সিভিল গার্ড পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। সমুদ্রে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ওয়াটার-সারফেস থেকে ৩০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার উঁচুতে ভাসমান নিউমেটিক বেড়া ও রানিং বয়া বসানো হচ্ছে এবং নৌবাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে। স্পেনের কঠোর অবস্থান ও আইনি ব্যবস্থার ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার মানুষ মরক্কোয় ফিরে গেছেন।

এই সংকট নিরসনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২২টি দেশ সীমান্ত নিরাপত্তা ও সহযোগিতা পর্যালোচনার জন্য ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই আলোচনার পক্ষে মত দিলেও ইতালির শেনজেন চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে ‘স্বার্থপর ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।