একটি আধুনিক ও কার্যকর পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি হলো নির্ভরযোগ্য তথ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্যের নিয়মিত প্রাপ্যতা নিশ্চিত না হলে বাজার মূলত গুঞ্জন ও ফাটকাবাজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিতে বিঘ্ন ঘটায়। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ত্রৈমাসিক (তিন মাসের) আর্থিক প্রতিবেদনের পরিবর্তে কেবল অর্ধবার্ষিক (ছয় মাসের) প্রতিবেদন প্রকাশের যে প্রস্তাব করেছে, তা পুঁজিবাজারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারণা, এই পদক্ষেপের ফলে কোম্পানিগুলোর কমপ্লায়েন্স বা আইনি কাগজপত্রের চাপ হ্রাস পাবে। তবে এর বিপরীতে বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হতে পারে অনেক বেশি। সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা, বাজারে সমতা বজায় রাখা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে তিন মাস অন্তর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘অসম তথ্য তত্ত্ব’-এর কথা বলা হয়েছে। সাধারণত কোনো কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও বড় শেয়ারধারীরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তুলনায় অনেক বেশি হালনাগাদ ও দ্রুত তথ্য পান। ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন এই বৈষম্য কমিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর সঠিক আর্থিক তথ্য প্রকাশে কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করে, ফলে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের বিনিয়োগকারী সমান সুযোগ পান।

প্রতিবেদন জমার সময়সীমা তিন মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হলে বাজারে ১৮০ দিনের একটি দীর্ঘ ‘তথ্যশূন্যতা’ তৈরি হবে। স্বচ্ছতার অভাব থাকা এই বাজারে এমন দীর্ঘ শূন্যতা অবৈধ ব্যবসা বা ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’-এর সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোম্পানির আয় হঠাৎ কমে গেলে বা বড় লোকসান হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মাসের পর মাস তা জানতে পারবেন না। এই সুযোগে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা আগেভাগেই নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যেতে পারেন, যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। এছাড়া, দীর্ঘ ছয় মাসের এই তথ্যশূন্যতায় স্টক এক্সচেঞ্জের স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থাও ব্যাহত হবে, ফলে শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি প্রকৃত আর্থিক উন্নতির কারণে নাকি কারসাজির ফলে হচ্ছে, তা যাচাই করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিশ্বের শক্তিশালী পুঁজিবাজারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, নিয়মিত করপোরেট স্বচ্ছতাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি। যেসব উন্নত দেশের আর্থিক ব্যবস্থা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে চায়, সেখানে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে ইউএস সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদের নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ও নাসডাকে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির জন্য কঠোরভাবে ত্রৈমাসিক ফাইলিং কার্যকর করে। পার্শ্ববর্তী ভারতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া এবং চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশনও একইভাবে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করে। তাদের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশ করতে হয়। তারা বিশ্বাস করে, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো এবং তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদনই সবচেয়ে বড় ঢাল।

ত্রৈমাসিক ফাইল জমা দেওয়াকে কোম্পানিগুলোর জন্য ‘অপ্রয়োজনীয় বোঝা’ হিসেবে দেখার যে যুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থা দিচ্ছে, তা পুঁজিবাজারের মূল দর্শনকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। বিএসইসি, সেবি কিংবা সিএসআরসির মতো সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের কঠোর কাঠামোর অধীনেই তালিকাভুক্তির নিয়মকানুন পরিচালিত হয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে স্বল্প খরচে মূলধন সংগ্রহ করে; এর বিনিময়ে তারা গোপনীয়তা ত্যাগ করে প্রতিনিয়ত কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে এবং কঠোর আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে বাধ্য।

ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন তুলে দেওয়ার এই প্রস্তাব স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক পশ্চাদপসরণ। বাংলাদেশ যদি স্বেচ্ছায় অর্ধবার্ষিক মডেলে ফিরে যায়, তবে আন্তর্জাতিক পোর্টফোলিও ম্যানেজার বা বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। তারা মনে করতে পারেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ডে পৌঁছানোর পরিবর্তে সুশাসনের নিয়ম শিথিল করছে, যা এ দেশের বাজারে পুঁজি বিনিয়োগের উৎসাহ কমিয়ে দেবে।

কোম্পানিগুলোর জন্য তিন মাসের হিসাব তৈরি করা কঠিন মনে হলে প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটাল ও সহজ করা উচিত, তবে তথ্যের প্রবাহ বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল দায়িত্ব হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা, কোম্পানির করপোরেট ব্যবস্থাপনার কাজের চাপ কমানো নয়। বিএসইসি যদি সত্যিই একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে চায়, তবে ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন অবশ্যই বাধ্যতামূলক রাখতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান আহমদ ইকবাল হাসান।