দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকার ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, উভয় পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ব্যবসায়ীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানানো হয়, এর আগে গত ৪ এপ্রিল একই ধরনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "দেশের অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই সরকারের লক্ষ্য। বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সরকার যেমন উপলব্ধি করছে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও তা অনুধাবন করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।"
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, "আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আবারও বৈঠকে বসবেন।" তিনি উল্লেখ করেন, "যত বেশি আলোচনা হবে, তত বেশি সমস্যা চিহ্নিত করা যাবে এবং কার্যকর সমাধানও বের করা সম্ভব হবে। দীর্ঘ সময় ধরে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই টেকসই সমাধান পাওয়া যায়।"
সরকারের বয়স এখনো ছয় মাস পূর্ণ হয়নি বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "এর মধ্যেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রথম বৈঠকে যেসব সমস্যা তুলে ধরা হয়েছিল, তার অনেকগুলোরই সমাধান হয়েছে। নতুন করে যেসব বিষয় সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়েও সরকার কাজ করবে।"
বিডা সূত্রে জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে আলোচিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকি সাতটি বিষয় এখনো প্রক্রিয়াধীন। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার একটি প্রাথমিক রূপরেখা উপস্থাপন করেন, যা অর্জনে কূটনৈতিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "এটা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ। খাতভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে সরকার যে আন্তরিক ও সচেষ্ট, তা তাঁদের জানানো হয়েছে। উদ্যোক্তারাও সরকারের পদক্ষেপে আশ্বস্ত হয়েছেন। আবার বৈঠক হবে।"
সূত্রমতে, বৈঠকে গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জবাবে সরকার জানায়, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় সাময়িকভাবে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ব্যবসায়ীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে স্থায়ী সমাধান আসবে। এজন্য তৃতীয় একটি এফএসআরইউ অনুমোদন এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের কাজ শুরু হয়েছে।
বৈঠক শেষে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী মুক্তকণ্ঠকে জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে আশ্বাস দিয়েছেন।
বিডা সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে ছোট ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুঁজি ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি রপ্তানি করতে পারে না। তাই বড় রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে এসএমই পণ্যের ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং শুল্ক সুবিধার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করতে বিডার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা বিএসটিআইয়ের বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনের দাবি জানান।
বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বৈঠকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথনকশা, জ্বালানি পরিস্থিতি, এসএমই উদ্যোক্তাদের রপ্তানি বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং আরও কিছু নতুন বিষয় বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে এ ধরনের সংলাপ ও গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত থাকবে।"
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সড়ক, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে উপস্থিত ছিলেন প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল, এপেক্স ফুটওয়্যারের সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ইনসেপ্টা গ্রুপের আবদুল মুক্তাদির, ডিবিএল গ্রুপের এম এ জাব্বার, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, বে ফুটওয়্যারের জিয়াউর রহমান, এসিআই লিমিটেডের আরিফ দৌলা, রানার গ্রুপের হাফিজুর রহমান খান, র্যাংগস গ্রুপের সোহানা রউফ চৌধুরী, ওয়ালটন হাই–টেক ইন্ডাস্ট্রিজের এস এম মাহবুবুল আলম, যমুনা গ্রুপের সালমা ইসলাম, সালমা গ্রুপের চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ শোয়েব, মুন্নু সিরামিকের মইনুল ইসলাম ও আবুল খায়ের গ্রুপের আবু সাঈদ চৌধুরী।