ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্ব অনুযায়ী সত্যের উৎস এক এবং সকল সঠিক জ্ঞান শেষ পর্যন্ত একই হাকিকতের দিকে ধাবিত হয়। তবে এই ধারণার সাথে সাথে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কোন জ্ঞানকে প্রকৃতপক্ষে সত্য বলা হবে? কোনো বক্তব্যের জনপ্রিয়তা, কার্যকারিতা কিংবা পরীক্ষাগারে পুনরাবৃত্তিযোগ্যতা কি সত্যের জন্য যথেষ্ট, নাকি সত্যের এমন কোনো গভীরতর মিজান বা মানদণ্ড রয়েছে যা বাস্তবতার বিভিন্ন স্তরকে একত্রে বিচার করে? এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া জ্ঞানের ঐক্যের দাবি অপূর্ণ থেকে যায়।
জ্ঞান ও সত্যের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি, আর জ্ঞান হলো সেই সত্যকে উপলব্ধি করার মানবিক কৌশল। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্যকে কেবল তথ্যের যথার্থতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় না। তথ্য সত্যের একটি স্তর হতে পারে, তবে তা সত্যের পূর্ণতা নয়। সত্য হলো সেই জ্ঞান, যা অস্তিত্বের প্রকৃত নেজামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, কোনো বক্তব্য তখনই সত্য হবে যখন তা সৃষ্টিগত বাস্তবতা, মানব-ফিতরাত, নৈতিক ইনসাফ এবং অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করবে না। এখানে সত্য কোনো বিচ্ছিন্ন তথ্য নয়, বরং একটি সামগ্রিক সামঞ্জস্য বা ইনসিজাম।
এই সামঞ্জস্য যত বিস্তৃত ও প্রগাঢ় হয়, জ্ঞানের সত্যতা তত গভীর হয়। মিথ্যা যেখানে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, সত্য সেখানে সংযোগ স্থাপন করে। সত্যের বৈশিষ্ট্যই হলো বাস্তবতার বিচ্ছিন্ন স্তরগুলোকে একটি অর্থপূর্ণ নেজামে সংযুক্ত করা। তবে সত্য এক হলেও তার উপলব্ধির স্তর ভিন্ন হতে পারে। কোনো জ্ঞান সত্যের আংশিক দিক ধারণ করতে পারে, আবার কোনোটি তা অধিকতর সামগ্রিকভাবে প্রকাশ করে। ফলে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্যের নিকটবর্তিতা ও দূরবর্তিতার একটি স্তরক্রম রয়েছে। যে জ্ঞান বাস্তবতা, ফিতরাত, নৈতিকতা ও ওহিগত মিজানের সঙ্গে যত বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা তত বেশি সত্যের প্রতিনিধিত্ব করে।
"ওহি এমন এক দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, যা সৃষ্টির সামগ্রিক নেজামকে একই সঙ্গে অবলোকন করে। ফলে সত্য নির্ণয় কোনো একক পরীক্ষার ফল নয়, বরং বহুস্তরীয় শাহাদতের মজমা।"
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা সত্যকে যাচাই করার জন্য চারটি প্রধান স্তরের কথা বলে। প্রথমত, বাস্তবতার সাক্ষ্য—যেকোনো জ্ঞানকে সৃষ্টিজগতের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিতরাতের সাক্ষ্য—মানুষের সুস্থ ও বিকৃতিমুক্ত অন্তঃপ্রকৃতি যদি কোনো বিষয়কে স্থায়ীভাবে অন্যায়, অমানবিক বা ভারসাম্যবিরোধী মনে করে, তবে সেই জ্ঞান পুনর্বিবেচনাযোগ্য। তৃতীয়ত, নৈতিক সাক্ষ্য—যে জ্ঞান ধারাবাহিকভাবে জুলুম, ধ্বংস ও আমানতভঙ্গের দিকে নিয়ে যায়, তা আংশিক কার্যকর হলেও পূর্ণ সত্যের মর্যাদা পায় না। চতুর্থত, ওহিগত সাক্ষ্য—মানুষের অভিজ্ঞতা আংশিক, যুক্তি সীমাবদ্ধ এবং পর্যবেক্ষণ পরিবর্তনশীল হওয়ায় ওহি এখানে প্রতিযোগী জ্ঞান নয়, বরং অস্তিত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাগত মিজান হিসেবে কাজ করে। কারণ সৃষ্টিকর্তাই অস্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানধারী।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা উপযোগবাদী সত্যতত্ত্ব থেকে আলাদা। কোনো ধারণা কেবল কার্যকর হলেই তা সত্য হয় না; ইতিহাসে বহু অন্যায় ব্যবস্থা দীর্ঘকাল কার্যকর থাকলেও তা ন্যায়সংগত হয়নি। একইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন সত্যের প্রমাণ নয়, কারণ সত্য ভোটের ফল নয় বরং বাস্তবতার সঙ্গে সংগতির ফলাফল। শুধু যুক্তিগত সামঞ্জস্যও যথেষ্ট নয়; কোনো ধারণা অভ্যন্তরীণভাবে সুশৃঙ্খল হলেও তা যদি মানবমর্যাদা, প্রকৃতির ভারসাম্য বা অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করে, তবে তা পূর্ণ সত্য হতে পারে না।
নতুন জ্ঞান সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না, বরং সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক ও বোধকে আলোকিত করতে পারে। সত্য অপরিবর্তনীয়, তবে মানুষের উপলব্ধি ক্রমাগত পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। তাই নতুন আবিষ্কার সত্যের শত্রু নয়, বরং সত্যের অধিকতর উন্মোচনের সম্ভাবনা। যখন নতুন জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত সত্যের সঙ্গে আপাতবিরোধ সৃষ্টি করে, তখন ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা সত্যকে নয়, বরং মানুষের ব্যাখ্যা, পদ্ধতি ও উপলব্ধিকে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানায়।
"সত্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার তাওহিদি চরিত্র। সত্য অস্তিত্বকে যথার্থ সম্পর্ক, উদ্দেশ্য ও আমানতের ভেতরে স্থাপন করে। ফলে সত্যের চূড়ান্ত রূপ হলো সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর বাতিলের চূড়ান্ত রূপ হলো সম্পর্কের বিচ্ছেদ।"
সত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ফলপ্রসূতা, তবে তা তাৎক্ষণিক সাফল্যের বদলে সৃষ্টিগত মিজানের সংরক্ষণের অর্থে। যে জ্ঞান মানুষকে আমানতদার করে, প্রকৃতির সঙ্গে ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপন করে, সমাজে ইনসাফ কায়েম করে এবং অন্তরকে ফিতরাতের দিকে রুজু করে, সেই জ্ঞান সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী। কারণ সত্য কেবল জানার বিষয় নয়, বরং অস্তিত্বকে তার যথার্থ স্থানে কায়েম করার শক্তি। বিপরীতে, বাতিল হলো সেই জ্ঞান যা নেজামের ভেতর বিচ্ছিন্নতা, জুলুম, ফিতরাতবিরোধিতা ও উদ্দেশ্যহীনতা তৈরি করে।
পরিশেষে, ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় সত্য কোনো একক তথ্য, বিচ্ছিন্ন যুক্তি কিংবা সাময়িক কার্যকারিতা নয়। এটি একটি সমন্বিত হাকিকত, যেখানে বাস্তবতা, ফিতরাত, নৈতিকতা, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও ওহি একই নেজামে এসে পরস্পরকে সাক্ষ্য দেয়। এই সাক্ষ্যগুলোর মধ্যে যত গভীর ইনসিজাম বা সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সত্য তত বেশি উন্মোচিত হয়। সত্য জানা মানে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা, যা মানুষ, প্রকৃতি ও সৃষ্টির সামগ্রিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অস্তিত্বকে তার যথার্থ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। সত্য তাই কেবল জ্ঞানের গন্তব্য নয়, বরং নেজামের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কুদরত। সত্য কোনো মানুষের মালিকানাধীন সম্পদ নয়; মানুষ কেবল সত্যের তলবকারী। সত্যকে অধিকার করার চেয়ে সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্যেই জ্ঞানের সাবালকত্ব নিহিত।
—মুসা আল হাফিজ: লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান।