নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার সাহতা ইউনিয়নের মধুপুর কওমি মাদ্রাসায় মসজিদ ও ইমামের বেতন নিয়ে কটূক্তির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই ব্যক্তিকে সালিসে মাথা ন্যাড়া করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার বিকেলে মধুপুর কওমি মাদ্রাসায় দরবার-ভিত্তিক সালিস বসিয়ে তাঁদের মাথা ন্যাড়া করা হয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মধুপুর ও হেলোচিয়া গ্রামের মাঝামাঝি হেলোচিয়া বাজার এলাকায় একটি মসজিদের ইমামের বেতন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে দেওয়া হয়। সম্প্রতি ইমামের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে এ বিষয়ে গত সোমবার বিকেলে বাজারে একটি সভা ডাকা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সভা শেষে লোকজন বাড়ি ফেরার সময় মধুপুর গ্রামের এক ব্যক্তি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বী আরেক ব্যক্তি সভার বিষয়টি জানতে চান। তাঁদের কথার পর মধুপুর গ্রামের ওই ব্যক্তি মসজিদ ও ইমামের বেতন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিও তাতে সায় দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে মসজিদ নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ আনা হয়।

এরপর বুধবার বিকেলে মধুপুর কওমি মাদ্রাসায় সালিস বসানো হয়। এতে মাদ্রাসার মোহতাসিম (প্রধান শিক্ষক) আলী আহম্মদ, বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সালিসে ওই দুই ব্যক্তি মসজিদ নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে ক্ষমা চান। তবু ধর্মীয় নেতাদের সিদ্ধান্তে তাঁদের মাথা ন্যাড়া করে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া প্রায় এক মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, মধুপুর কওমি মাদ্রাসার বারান্দায় লোকজনের উপস্থিতিতে মেশিন দিয়ে প্রথমে সনাতন ধর্মাবলম্বী ওই ব্যক্তির মাথা ন্যাড়া করা হচ্ছে। পরে একই স্থানে বসিয়ে অপর ব্যক্তির মাথাও ন্যাড়া করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর লোকলজ্জা ও অপমানে ওই দুই ব্যক্তি বাড়িতেই অবস্থান করছেন এবং কারও সঙ্গে কথা বলছেন না।

এক ভুক্তভোগীর ভাতিজা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর চাচা ও তাঁর সঙ্গে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি মসজিদ, ইমাম বা আল্লাহ-রাসুলকে নিয়ে কোনো কটূক্তি করেননি। তাঁর চাচা শুধু মসজিদের ইমামের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এত মানুষ উপস্থিত ছিল, কিন্তু কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি। আমরা এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি চাই।’

এ বিষয়ে আজ শুক্রবার হেলোচিয়া বাজার জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক রঙ্গু মিয়া বলেন, ‘আমি সালিসে ছিলাম না। এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে কেউ অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে বিচার করা প্রয়োজন।’

সালিসে উপস্থিত ছিলেন মধুপুর কওমি মাদ্রাসার মোহতাসিম আলী আহম্মদ। তিনি আজ শুক্রবার সকালে মুঠোফোনে বলেন, স্থানীয় দরবার সালিসের মাধ্যমে ছোট আকারে কাজটি শেষ করে দেওয়া হয়েছে। থানায় অভিযোগ করলে জিনিসটি বড় হয়ে যায়। এ ছাড়া অভিযুক্তদের গার্জিয়ান (অভিভাবক) আমাদের সুপারিশ করেছেন, বিষয়টি শেষ করে দিতে। উভয় পক্ষের অভিভাবকও দরবারে ছিলেন। তাঁদের অনুমতিতেই কাজটি (মাথা ন্যাড়া) করা হয়েছে। এখন এটাকে নিয়ে একটু বিরূপ প্রক্রিয়া চলতেছে। এখানে আমার তো একক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।’

এ বিষয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে বিষয়টি নজরে এলে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।