স্পেনের সমুদ্রবেষ্টিত ভূখণ্ড সেউতায় মাত্র একদিনে রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। অভিবাসীর এই সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। সমুদ্র সাঁতরে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৪১ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। উপকূলে মরদেহের পাশাপাশি ভেসে আসা জুতা, পোশাক ও অন্যান্য আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

নজিরবিহীন এই অনুপ্রবেশের ফলে মরক্কো-স্পেন সীমান্তে চরম সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই দেশই নিরাপত্তা জোরদার করেছে। তবে আফ্রিকার ভূখণ্ড হয়ে সমুদ্র ও স্থলপথে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রবেশের ঘটনাকে ‘স্পেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।

বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সংকটজনক এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার (৩১ জুলাই) জরুরি সেউতা সফর শেষে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ মানব পাচারকারী চক্রকে দায়ী করে বলেন, ‘চোরাচালানকারীরা তরুণ-তরুণীদের ভুল বুঝিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস সাংবাদিকদের জানান, গত এক দিনে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা সেউটার মোট জনসংখ্যার (প্রায় ৮৫ হাজার) ৭০ শতাংশের সমান। পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ অসহনীয়’ উল্লেখ করে তিনি দ্রুত কেন্দ্রীয় সহায়তা দাবি করেছেন।

সিভিল গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র পার হতে গিয়ে এবং সীমান্ত বেড়ার তারাজাল সৈকতে পদদলিত হয়ে অন্তত ৪১ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। উপকূলে মরদেহের পাশাপাশি বয়া, জুতো ও পোশাক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।

সীমান্তের মরক্কো অংশ ও সেউতার প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অভিবাসীদের তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে মরক্কো পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। এর প্রতিক্রিয়ায় অভিবাসন প্রত্যাশীরা সীমান্তে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পরিস্থিতির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় জোটটির প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এই ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে অবৈধ সীমান্ত পারাপার অবিলম্বে বন্ধের তাগাদা দিয়েছেন।

সংকটের প্রভাবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে স্পেনের সঙ্গে ‘শেনগেন উন্মুক্ত সীমান্ত চুক্তি’ স্থগিত করার হুমকি দিয়েছেন ইতালি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। পাশাপাশি ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে কড়া নজরদারির ঘোষণা দিয়েছে।

স্পেন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে বলা হয়েছিল যে, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে পুশব্যাক বা নির্বাসিত করা যাবে না। পাচারকারী চক্র এই আইনি রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে দেওয়ায় হাজার হাজার অভিবাসী সীমান্ত অতিক্রম করতে উৎসাহিত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী সানচেজের উদার অভিবাসন নীতির কড়া সমালোচনা করে একে দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে।

বর্তমানে মরক্কোর অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সেউতা ও সংলগ্ন অপর স্প্যানিশ শহর মেলিলার সীমান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমুদ্র সাঁতরে ও ছোট নৌকায় শত শত অভিবাসীর আসা অব্যাহত রয়েছে।