ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের আলোচনায় সম্মত হয়েছে প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী হামাস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘোষণা দিলেও উপত্যকাটি থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনার বিষয়ে এখনও রাজি হয়নি ইসরায়েল। উল্টো হামাসের সম্মত হওয়া চুক্তিটির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে শুক্রবার (৩১ জুলাই) জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনায় একটি ‘যুগান্তকারী অগ্রগতির’ ঘোষণা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে এই দুটি বিষয়ই ছিল প্রধান বাধা।
তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিকল্পনার জবাব দেয়নি এবং স্বাক্ষরিত চুক্তি নিয়ে দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, চুক্তির আওতায় গাজায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি একে যুদ্ধ বন্ধের পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইসরায়েল এতদিন হামাসের নিরস্ত্রীকরণ না হওয়াকে গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা, পুনর্গঠনের অনুমতি না দেওয়া এবং অক্টোবরের যুদ্ধবিরতিতে নির্ধারিত সীমারেখার বাইরে সেনা মোতায়েনের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।
কায়রোতে কয়েক মাসের আলোচনার পর ট্রাম্পের গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (বিওপি) হামাসকে একটি রোডম্যাপে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ করা হবে। একই সঙ্গে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাকে সহায়তা করবে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ ও ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলিস্টেশন ফোর্স (আইএসএফ)।
গাজায় বিওপির উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, “গাজায় নিরস্ত্রীকরণ ও বেসামরিক প্রশাসনে রূপান্তর নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত কঠিন আলোচনা করতে হয়েছে। অনেক সময় তাদের মনে হয়েছে, এই আলোচনা সফল হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “চুক্তিতে কী লেখা আছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন। নিরস্ত্রীকরণের পাশাপাশি সেনা প্রত্যাহারও সমানতালে এগোতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকরভাবে যাচাই করতে হবে।”
শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি গ্রহণের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, গাজা নিয়ে ইসরায়েলের একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হলো হামাসকে নির্মূল করা এবং ফিলিস্তিনিদের গাজা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে উৎসাহ দেওয়া।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১৩ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “চুক্তির সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।” এটি হামাসের সময়ক্ষেপণের একটি চেষ্টা মাত্র বলে তারা মনে করে। রয়টার্সকে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে কোনো আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে ইসরায়েল হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ চায়, যার মধ্যে গাজা থেকে সব অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া এবং পুরো ভূখণ্ডকে নিরস্ত্রীকরণ অন্তর্ভুক্ত। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিকল্পনা এসব দাবির সন্তোষজনক জবাব দেয় না এবং ইসরায়েল এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন করার শর্তে তারা রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজী হামাদ আলজাজিরাকে বলেন, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে তারা নিরস্ত্রীকরণে কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। এএফপিকে দেওয়া পৃথক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, ইসরায়েলকে আগে নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসরায়েল যদি তা না করে, তাহলে হামাসও চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না।”
ম্লাদেনভের এই রোডম্যাপে সম্মতি দিয়ে হামাস গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চাপ আরও বাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হামাস নিরস্ত্র হবে কি না সে বিষয়ে ইসরায়েল এখনও সন্দিহান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল যদি চুক্তি অনুযায়ী নিজের বাধ্যবাধকতা পালন না করে, তাহলে ট্রাম্প এতে ‘খুবই হতাশ’ হবেন।
চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস তাদের অস্ত্র গাজার প্রশাসনের জাতীয় কমিটির (এনসিএজি) কাছে হস্তান্তর করবে, যাকে সহায়তা করবে ফিলিস্তিনি পুলিশ ও আইএসএফ। তবে এনসিএজির ১৩ সদস্যকে এখনও গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষণও শুরু হয়নি। এছাড়া মরক্কো ও কসোভোর মতো দেশগুলো আইএসএফে সেনা পাঠানোর আগ্রহ দেখালেও তাদের সদস্যরা এখনও গাজায় পৌঁছাননি।
বিওপির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হলে প্রথমে ১৪ দিনের জন্য সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে। এই সময়ে উভয় পক্ষ চুক্তি মেনে চলছে কি না, তা তদারকির জন্য একটি আন্তর্জাতিক যাচাই কমিটি (আইভিসি) গঠন করা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, যাচাই এবং পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা। কোনো পক্ষ শর্ত না মানলে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তিনি আরও জানান, কোনো ধাপে বেশি সময় প্রয়োজন হলে আইভিসি অতিরিক্ত সময় দিতে পারবে, কারণ শুরু থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছে এই প্রক্রিয়া সহজ হবে না এবং বাস্তবায়নের পথে নানা বাধা আসতে পারে।