কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে বারবার অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির। প্রশ্ন উঠছে—প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনায় তিনি কেন কোনো কক্ষে উপস্থিত থাকছেন না। গত ১২ বছরে এমন অনুপস্থিতি বিরল বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে।
বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছে, শিক্ষার্থীদের ওপর ছররা গুলি চালানো কিংবা একে–৪৭ রাইফেল থেকে গুলি ছোড়ার দায় অমিত শাহের দিকে যাচ্ছে। তবে বিতর্ক চলাকালীন কক্ষে না থাকা এবং সংসদে জবাব না দেওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনি লোকসভা কিংবা রাজ্যসভা—কোনো কক্ষেই উপস্থিত হননি বলে বিরোধীরা দাবি করছে।
শুক্রবারও অমিত শাহকে দেখা যায়নি। এদিন সকাল থেকে সংসদ ভবন চত্বরে তাঁকে নিয়ে বিক্ষোভ দেখায় বিরোধীরা। তাঁদের হাতে বিশাল এক পোস্টার ছিল। সেখানে হিন্দিতে লেখা, অমিত শাহ কেন সংসদ থেকে উধাও? অমিত শাহকে যাবতীয় পুলিশি বর্বরতার জন্য দায়ী করার পাশাপাশি বিরোধীরা রাম মন্দিরের টাকা চুরির বিষয়টিও সামনে আনে।
বিরোধীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারকে কোণঠাসা করতে তারা অযোধ্যায় রাম মন্দিরের কোষাগার লুটের প্রসঙ্গও সামনে আনছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই শুক্রবার লোকসভা ও রাজ্যসভা সারা দিনের মতো মুলতুবি হয়ে যায়।
লোকসভায় এরপর রাজ্যসভাতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় রাজ্যসভার বিরোধী নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বৃহস্পতিবার বলেন, পুলিশি বর্বরতার জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিতেই হবে। নইলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে খ্যাত কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও অমিত শাহের অনুপস্থিতিকে ঘিরে বক্তব্য আসতে থাকে। তৃণমূলের সমালোচনাও একই সুরে জোরালো হয়েছে। কংগ্রেস সভাপতির ভাষায়, তিনি বলেন, ‘উনি ঘরের দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে রয়েছেন। ভাবছেন এভাবেই কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু আমরা তা হতে দেব না। ঘর থেকে টেনে বের করব।’
প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে সংশোধনী বিল পাসের পক্ষে বিরোধীদের সম্মতির পেছনে তাদের যুক্তি ছিল দুই দিক থেকে। প্রথমত, বিলটির বিরোধিতা করলে সরকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে বলতে পারত, বিরোধীরা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চায় না। তাই, বিল পাসে সহযোগিতা করছে না—এ যুক্তি তুলে বিরোধীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
দ্বিতীয়ত, কৌশলগত কারণে তারা বিতর্কে রাজি হয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে। বিরোধীদের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়বদ্ধতা সামনে আনা এবং তাঁকে জবাবদিহিতে বাধ্য করা। কিন্তু সরকারের তরফে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি—অমিত শাহ কোনো কক্ষে যাননি বলে বিরোধী পক্ষের বক্তব্য। প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে সংশোধনী বিলটি পেশ করেন কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।
অমিত শাহ কেন সভায় নেই জানতে চাইলে লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান দুজনই জানিয়ে দেন, বিল উত্থাপক মন্ত্রী রয়েছেন। জবাব তিনিই দেবেন। ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যেমন ১২ বছরে একবারের জন্যও জবাবদিহিতে বাধ্য করা যায়নি—এই প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অত্যাচার নিয়েও অমিত শাহকে জবাবদিহিতে বাধ্য করাতে তারা পারেননি।
তবে অনুপস্থিতির মধ্যেও সমালোচনার বিষয়টি থামেনি। লোকসভায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। বিরোধীদের ভাষ্যমতে, অত্যাচারের নির্দেশ অমিত শাহরই দেওয়া বলেও বক্তব্য আছে। তাঁর সম্মতি ছাড়া ছররা গুলি চলতে পারে না—এ যুক্তিও তুলেছেন রাহুল।
রাহুল আরও বলেছিলেন, যদি অমিত শাহ বলেন নির্দেশ দেননি, তাঁর নির্দেশ ছাড়াই গুলি চলেছে, তা হলে তিনি অপদার্থ। সেই কারণেও তাঁর পদত্যাগ করা দরকার। গত বুধবার লোকসভায় রাহুলের ওই যুক্তি অমিত শাহর কাছে ছিল শাঁখের করাত।
বিজেপি নেতা সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর অবশ্য রাহুলের বিরুদ্ধে অধিকারভঙ্গের নোটিশ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, শাহ যে নির্দেশ দিয়েছেন, রাহুল তা প্রমাণ করুন। নয়তো ক্ষমা চান। রাজ্যসভায় খাড়গেকেও ক্ষমা চাইতে বলেছেন বিজেপি নেতারা। তারা মনে করে, অমিত শাহকে ‘ঘর থেকে টেনে বের’ করে আনার কথা বলে খাড়গে হিংসায় উসকানি দিয়েছেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণের পর শিক্ষার্থীদের নজরে যে অমিত শাহকে আনা হচ্ছে—সিজেপি নেতাদের কথাতেও তা প্রতিফলিত হতে দেখা গেছে। রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের সুর ধরে সিজেপি নেতারাও বলছেন, অমিত শাহর নির্দেশ ছাড়া পুলিশ, র্যাফ ও সিআরপিএফ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভাঙতে এভাবে অত্যাচার করতে পারত না। সেখান থেকে তাদের দাবি, অত্যাচারের নির্দেশ অমিত শাহরই দেওয়া—ইস্তফা তাঁরই উচিত।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বুধবার রাহুলের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। বৃহস্পতিবার সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও রাহুলকে সমর্থন জানিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ২০ জুলাই যেভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে, পেলেট গান থেকে ছররা গুলি ছোড়া হয়েছে, বিহারে একে–৪৭ থেকে গুলি চালানো হয়েছে, তা অমিত শাহর নির্দেশ ছাড়া হতে পারে না। এ জন্য অমিত শাহর পদত্যাগ করা উচিত।
অভিজিৎ বলেন, দিল্লি পুলিশ অমিত শাহর অধীন। র্যাফ, সব আধা–সামরিক বাহিনী তাঁর অধীনে। তাঁর নির্দেশ ছাড়া কী করে তারা এমন বলপ্রয়োগ করতে পারে? ওই অত্যাচারের দায় পুরোপুরি তাঁরই। তিনি কিছুতেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। রাহুল গান্ধী ঠিকই বলেছেন।
সিজেপি বিদেশি অনুদান পাচ্ছে বলে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে—এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে অভিজিৎ বলেন, ‘সেটাও তো তাহলে অমিত শাহর আরেক ব্যর্থতা। আমরা বিদেশি অনুদান পেলে তা আটকানো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ। তিনি তাহলে সে কাজেও ব্যর্থ। বিদেশি অনুদান রুখতে পারছেন না। সেই জন্যও তাঁর ইস্তফা দেওয়া উচিত।’
তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য মহুয়া মৈত্রও বলেছেন, সব দায় অমিত শাহরই। দিল্লি পুলিশ তাঁর অধীন। আধা–সামরিক বাহিনী তাঁর অধীন। র্যাফ তাঁর অধীন। তাহলে দায় কেন তাঁর নয়?
পুলিশি অত্যাচার, ছররা গুলি চালানো নিয়ে পুলিশি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে মহুয়া বলেন, অমিত শাহ কিছুতেই দায় এড়িয়ে থাকতে পারবেন না। কারণ, যাঁরা ছররা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই অমিত শাহর অধীনে। দায়িত্ব তাঁকে নিতেই হবে।
এই ধারাবাহিক অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনা—অমিত শাহ কত দিন সংসদ এড়িয়ে থাকতে পারেন।