উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করে কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পাঁচ বছরের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি অনুমোদিত হয়েছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং জনবল বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করাই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই চুক্তিটি কোনো সরাসরি সামরিক জোট নয় এবং এতে একে অপরের হয়ে যুদ্ধ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে, যা এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

চুক্তিটি ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত হলেও চলতি বছরের জুলাই মাসে কুয়েত আনুষ্ঠানিকভাবে তা অনুমোদন করে। এর পরপরই কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ ইসলামাবাদ সফর করেন। ওই সফরে দুই দেশ নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়।

সৌদি আরবের পর কুয়েত পাকিস্তানের জন্য দ্বিতীয় বড় উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা অংশীদার হয়ে উঠল। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে অন্য দেশের বিরুদ্ধেও আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনার ঘোষণা দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে প্রশিক্ষক ও সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে এবং অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানকে বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নৌরাহ আল-শুয়াইবি বলেন, "আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তি খুব ব্যতিক্রমী নয়। তবে বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।"

তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে কুয়েত এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে। তিনি আরও বলেন, "পাকিস্তানের বড় ও অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সমুদ্র নিরাপত্তায় দক্ষতা দেশটিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।"

চুক্তির আওতায় সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, ড্রোন মোকাবিলা সক্ষমতা, সমুদ্র নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উদ্যোগের মতো বিষয়গুলোতে সহযোগিতা বাড়বে। এছাড়া চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি যৌথ সামরিক কমিটি গঠন করা হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দিতে চায় না, বরং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একাধিক নির্ভরযোগ্য অংশীদার তৈরি করতে আগ্রহী। পাকিস্তানের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক ইয়াসির হুসেইন বলেন, "কুয়েতের এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।"

তার মতে, সৌদি আরব ও কুয়েতের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পাকিস্তানকে ইরানবিরোধী কোনো জোটে পরিণত করছে না। বরং তেহরান, রিয়াদ ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় ইসলামাবাদ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক আসিফ দুররানি মনে করেন, বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, "উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বহুদিনের। নতুন চুক্তিটি সেই সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করেছে মাত্র।"

চুক্তি অনুমোদনে তিন বছর সময় লাগার পেছনে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "চুক্তি অনুমোদনে তিন বছর সময় লাগার পেছনে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুমোদনের গতি বাড়িয়ে থাকতে পারে।"

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় জলপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি, ইরান-সংকট এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়ছে। যদিও এই চুক্তিতে সেনা মোতায়েন বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতার মাধ্যমে ইসলামাবাদ ভবিষ্যতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।