মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বুধবার রাতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর দেশটির পক্ষ থেকে ক্ষতিসহ নানা দাবি সামনে এসেছে। একই সময় ইরানের জবাবি পদক্ষেপের কথা বলা হয়; তাতে কুয়েত ও জর্ডানসহ অঞ্চলজুড়ে নতুন করে সতর্কতা ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বুধবার দিনের বেলা প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব—এমন খবরও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে হুতিদের হামলার প্রেক্ষাপট, মিসরের বন্দরে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল–মানদেব প্রণালি—জ্বালানি পরিবহনের বড় দুই রুট ঘিরেও উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে কয়েক দিন ধরে আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, আলোচনা ‘ভালো’ চলছে। ইরানও আলোচনার কথা জানিয়েছিল। তবে হামলার পরের পরিস্থিতিতে ওই প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি—এমন আভাস দিচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণ এসেছে।
বুধবার রাতে ইরানে মার্কিন হামলার আগে ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা ওদের (ইরান) ওপর কঠোর হামলা চালাব। ওরা কঠিন শাস্তি পাবে।’ আর হামলার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, যত দিন মার্কিন হুমকি থাকবে, তত দিন নিজেদের রক্ষায় যা দরকার করবে তেহরান।
সংঘাত চলতে থাকলে তা আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, গুতেরেস কিছুদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে আলোচনায় না ফিরলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, সেটাই ঘটছে। এগুলো ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে না।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পরিস্থিতি ধাপে ধাপে এগিয়েছে। ৮ এপ্রিল প্রথম যুদ্ধবিরতি হয়। এরপর স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার কথা থাকলেও অগ্রগতি হয়নি। এরপর ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারকে সই হয় দুই দেশ। তবে হরমুজ নিয়ে বিরোধের জেরে সেই স্মারকও কার্যত ভেঙে পড়ে। এর পর ৭ জুলাই থেকে টানা ১৩ দিন পাল্টাপাল্টি হামলা হয়; এরপর পাঁচ দিন বিরতি ছিল।
এই বিরতির মধ্যেই আবার আলোচনার আশা জাগলেও জর্ডানে মার্কিন একটি ঘাঁটিতে হামলার পর বুধবার রাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে হামলা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, জর্ডানে হামলার প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা চালানো হয়েছে। আরও হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে।
হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর দেশটির গণমাধ্যমে এসেছে। কেশম দ্বীপে হামলায় তিন বেসামরিক ইরানি নিহত হয়েছেন। জানজান প্রদেশে নিহত হয়েছেন আইআরজিসির তিন সদস্য। এছাড়া বুশেহর প্রদেশের বুশেহর, জাম ও খোরমোজ শহর, খুজেস্তান প্রদেশের আহভেজ শহর, ফারস প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা, হোরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাস এবং কিশ দ্বীপ আক্রান্ত হয়েছে—এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার সমালোচনা করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক ট্রিটা পারসি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এ হামলায় ট্রাম্পের লক্ষ্য কী? হামলা চালিয়েও ইরানকে আলোচনায় ফেরাতে পারেননি তিনি। আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া তাঁর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাই এ যুদ্ধ আবার শুরু করা স্পষ্টতই একটি ভুল।’
এদিকে বুধবার রাতের হামলার পর একটি হুমকি দিয়েছিল আইআরজিসি। তাদের ভাষায়—‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ সহায়তায় আজ আগ্রাসনকারীদের শাস্তি দেওয়া হবে।’ এর পর থেকে কুয়েত ও জর্ডানে ব্যাপক হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চলছিল হামলা। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ করপোরেশন কাউন্সিল (জিসিসি)।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, কুয়েতের আলী–আল–সালেম সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে; ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা থাকেন। এতে ড্রোন রাখার দুটি হ্যাঙ্গার ও একটি জ্বালানি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় একটি বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের। হামলায় ওই ভবনে থাকা এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
জর্ডানের আল–আজরাক বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। বাহিনীটির ভাষ্যমতে, হামলায় ঘাঁটিতে থাকা তিনটি মার্কিন এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। আরও তিনটি যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এ দাবি নাকচ করে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেই ইসরায়েলের হামলাও চলমান বলে বিভিন্ন সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবারও ব্যতিক্রম ছিল না। এদিন উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের হাসপাতাল থেকে ছয়টি মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারজন আগের ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতায় মোট ৭৩ হাজার ৩৪১ জন নিহত হলেন।
ইরানের যুদ্ধের আগে ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষাপট নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বুধবার রাতেও ইসরায়েলের হামলায় কেঁপে ওঠে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রাম। উপকূলবর্তী টায়ার শহর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল বিস্ফোরণের শব্দ। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, ভোর পর্যন্ত আল–মানসুরি, মাজদাল জৌন ও মাজরাত বুয়ুত আল–সিয়াদ গ্রামে বোমায় বিস্ফোরণ ঘটায় ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল সিরিয়ার কুনেইতরা এলাকায়ও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছালেও শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চলছে বলে জানায় মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। জুনে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় আলোচনা শুরু করতে তৎপরতা চালানোর কথা জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি। তিনি বলেন, সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদা আলোচনা করছে ইরান। তেহরান চায়, এই নৌপথে তাদের নির্ধারিত পথে জাহাজ চলবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া—হরমুজের দক্ষিণে ওমান উপকূল–সংলগ্ন পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হবে। দুই পক্ষের এ বিরোধে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। ওমান উপকূল দিয়ে কোনো জাহাজ চললে ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে—এ কথাও আলোচনায় এসেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরানে ওমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণেই বন্ধ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড হলো হরমুজে ইরানের জাহাজে হামলা এবং ইরানের বন্দরে অবরোধ। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা চলার কথা বললেও এখনো কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন গবেষক ট্রিটা পারসি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই মনে করছে আরও সামরিক অভিযান চালানোর পর যুদ্ধে তারা ভালো অবস্থানে আসবে। এ কারণেই সমঝোতা হতে দেরি হচ্ছে। তবে শেষ কথা হলো আলোচনার ভিত্তিতেই যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
সংঘাতের মধ্যে পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং সামরিক পদক্ষেপ নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।