বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, এই সংকটে রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেওয়ার দায়ভার কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রহীনতা এবং দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতির কারণে রোহিঙ্গারা মানব পাচারের চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, জুনের শেষ দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছেড়ে আসা দুটি নৌযান উপকূলে ডুবে গেছে। নৌযান দুটিতে ৫০০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন, যাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। খবরে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থীশিবির থেকেও যাত্রা শুরু করেছিলেন।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করেন, যার মধ্যে আনুমানিক ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সমুদ্রপথে যাত্রা করা এই মানুষের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী ও শিশু। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন নিখোঁজ হয়েছেন অথবা মারা গেছেন। বিশ্বের শরণার্থী ও অভিবাসীদের ব্যবহৃত সমুদ্রপথগুলোর মধ্যে এই পথেই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।

মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগেও বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে বিশেষ করে শিশু ও তরুণেরা মানব পাচারের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া শিবিরগুলোতে থাকা নারী ও কন্যাশিশুরা পাচার এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন; প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন এমন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুযোগ-সুবিধার এই অভাবকে কাজে লাগাচ্ছে মানব পাচারকারী চক্র। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্র চাকরি, শিক্ষা বা বিয়ের ভুয়া প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করছে। এমনকি নিজেদের দলে টানতে বা ব্যবহার করতেও তাদের পাচার করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুসহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কয়েক দিন পর্যন্ত থানায় আটকে রাখা হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার মতো চরম মানসিক আঘাত পাওয়ার পরেও তারা আইনি সহায়তা, মানসিক সহায়তা বা চিকিৎসাসেবা পান না।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সহায়তা প্রদানকারী বিভিন্ন মানবিক সংস্থা মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তবে তহবিলে বড় ধরনের কাটছাঁটের কারণে বর্তমানে এই সংস্থাগুলোর সক্ষমতা কমেছে।

মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জেন্ডার সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রাধান্য দিয়ে সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন অবস্থার অবসান ঘটানো এবং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাফেরার স্বাধীনতা ও সার্বিক সুরক্ষা সেবার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

এই বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এই বিশেষজ্ঞ দলের মধ্যে রয়েছেন সিওভান মুল্যালি (নারী ও শিশু পাচারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার), জেহাদ মাদি (অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার) এবং নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি ক্লদিয়া ফ্লোরেস, সহসভাপতি ইভানা ক্রটিচ, ডরোথি এস্ত্রাদা-ট্যাঙ্ক, হাইনা লু ও লরা নিরিনকিন্দি।