প্রযুক্তির দ্রুত উৎকর্ষের সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা বা পরামর্শ করার পরিবর্তে অনেক কর্মী এখন সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছেন। এতে কাজের গতি বাড়লেও সহকর্মীদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা কর্মীদের শেখার প্রক্রিয়া, দলগত সহযোগিতা এবং পেশাগত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলাপ-আলোচনার জায়গাটি ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে এআই চ্যাটবট। চলতি মাসে কগনিটিভ অ্যাসেসমেন্ট প্ল্যাটফর্ম মাইআইকিউ-এর এক জরিপ অনুযায়ী, এআই ব্যবহারকারী ৭৪ শতাংশ কর্মী এখন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে সহকর্মীর পরিবর্তে চ্যাটবট ব্যবহার করছেন।
মে মাসে প্রকাশিত ওয়ার্কডের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, জেন–এক্স প্রজন্মের তুলনায় জেন–জেড কর্মীরা সহকর্মীদের সঙ্গে নিজেকে ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন’ মনে করার সম্ভাবনা ১২ গুণ বেশি। এছাড়া জুলাইয়ে অ্যাডোব ফর বিজনেস পরিচালিত এক জরিপে ৬৮ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, সহজ বা সাধারণ কোনো প্রশ্ন সহকর্মীকে করার চেয়ে চ্যাটবটকে করতেই তাঁরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) প্রশিক্ষক অ্যাডাম মেন্ডলার বলেন, “এআই যেমন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে মানুষে মানুষে যোগাযোগ টিকিয়ে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যেন মানুষের সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ি।”
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর একটি বিপণন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৫ বছর বয়সী মারিয়া গোয়ালের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁর মতে, অফিসের প্রায় সব ধরনের কাজেই এখন কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার হচ্ছে। ফলে অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছে প্রশ্ন করা, পরামর্শ চাওয়া বা নতুন কোনো ধারণা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ আগের তুলনায় কমে গেছে। এর ফলে সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক কাজই এখন একজন মানুষের বদলে একটি যন্ত্র করে দিচ্ছে। এর ফলে নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন মনে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক প্রশ্নোত্তর বা আলোচনা শুধু সমস্যার সমাধানই করে না, বরং এর মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও জ্ঞান ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। একটি কার্যকর দল গঠনের ক্ষেত্রে এই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইনস্টিটিউট ফর লাইফ অ্যাট ওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিজ্ঞানী কনস্ট্যান্স নুনান হ্যাডলি, যিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক, একাকিত্ব ও দলগত আচরণ নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁর মতে, “কোনো সহকর্মীর কাছে প্রশ্ন করা, আন্তরিকভাবে উত্তর পাওয়া এবং পরে সুযোগ হলে তাঁকেও সহায়তা করা—এসবের মধ্য দিয়েই কর্মক্ষেত্রে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়।”
তবে এআই ব্যবহারের কিছু ইতিবাচক দিকও গবেষণায় উঠে এসেছে। মাইআইকিউর জরিপে অংশ নেওয়া ৭১ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, আগের তুলনায় তারা এখন নিজের কাজ আরও স্বাধীনভাবে করতে পারছেন। ৬২ শতাংশের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। অন্যদিকে, ওয়ার্কডের জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ কর্মী বলেছেন, এআই তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।