মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা ও অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করতে ডিফেন্স জায়ান্ট লকহিড মার্টিনের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। প্রায় ৫৮.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই চুক্তির মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।

গত বুধবার (২৯ জুলাই) পেন্টাগনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার প্রক্সিদের বিরুদ্ধে নিজস্ব সামরিক অভিযানে মার্কিন বাহিনী ব্যাপকভাবে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, লকহিড মার্টিনের সঙ্গে এই নতুন চুক্তির মাধ্যমে গত এপ্রিল মাসে স্বাক্ষরিত ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এক বছরের অস্থায়ী চুক্তিটিকে সাত বছর মেয়াদি একটি বিশাল খসড়া চুক্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৩২ অর্থবছর পর্যন্ত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের বৃহৎ মজুত ও উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

বর্তমানে অস্ত্র ঠিকাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের গতি ত্বরান্বিত করাই পেন্টাগনের প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড দেওয়ার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রেথিওনের মূল সংস্থা আরটিএক্সের সঙ্গেও একই ধরনের এমটি মেগা চুক্তি করেছে পেন্টাগন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বার্ষিক উৎপাদন বর্তমানের ৬০ ইউনিট থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ইউনিটে উন্নীত করা হবে।

মেরিল্যান্ড রাজ্যের বেথেসডায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন জানিয়েছে, পেন্টাগনের এই বিপুল অর্থায়নের ফলে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পিএসি-৩ এমএসই মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে।

এর ফলে আরকানসাস রাজ্যের ক্যামডেনে অবস্থিত তাদের প্রধান কারখানায় কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০-এ উন্নীত হবে। প্রতিষ্ঠানটি আগেই ঘোষণা করেছিল যে, তারা প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন বছরে ২ হাজার ইউনিটে উন্নীত করবে।

কোম্পানিটি আরও নিশ্চিত করেছে যে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত আলাবামা ও আরকানসাসসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২০টিরও বেশি অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনার আধুনিকীকরণে তারা নিজেরাই ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি ডলার পুনরায় বিনিয়োগ করছে।

উল্লেখ্য, ‘পিএসি-৩ এমএসই’ মূলত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অত্যাধুনিক আঘাত-প্রতিরোধক (হিট টু কিল) ইন্টারসেপ্টর। এই ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানকে মাঝআকাশেই নির্ভুল আঘাত করে ধ্বংস করতে সক্ষম।

এদিকে, ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস) সম্প্রতি এক সমীক্ষায় সতর্ক করে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে তীব্র ব্যবহারের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে বর্তমানে ১ হাজারের কম প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ও ২৫০টিরও কম ‘থাড’ ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে। এই স্বল্প সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অত্যন্ত নড়বড়ে ভূমিকা রাখতে পারে।