টানা বৃষ্টিপাতের ফলে গাইবান্ধার নদ-নদীর পানি হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে সাথে তীব্র স্রোত তৈরি হয়েছে, যার ফলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। জেলার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষ এখন দিশেহারা। এরই মধ্যে বাঙালি নদীর প্রবল ভাঙনের মুখে পড়েছে সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এলজিইডির নির্মিত ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘ত্রিমোহনী সেতু’।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদরের সাথে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার কমিয়ে আনতে বাঙালি নদীর ওপর ৩৬০.৪০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল।

গত বুধবার (২৯ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত চরগুলোতে পানি কমলেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গোবিন্দগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলার সংযোগকারী ত্রিমোহনী সেতুর পাশেই শুরু হয়েছে এই ভাঙন।

সেতুর পাশের বসতবাড়ির বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী শিউলি বেগম বলেন, "রাত হলে ঘুম আসে না, কখন যেন ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়! কত লোক আসে-যায়, কিন্তু কেউ তো খোঁজ নেয় না। কেউ তো একবারও নদী বাঁধার কথা বলল না! আমরা মহা বিপদে আছি।"

রামনগর গ্রামের মকবুল ইসলাম জানান, বাঙালি নদীর ত্রিমোহনী ঘাট এলাকায় ব্লক বসানো হয়নি, ফলে সেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় স্রোতের তোড়ে সেতুটির একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

একই গ্রামের মোকছেদুর রহমান বলেন, "গত ১০-১৫ বছরে বাঙালি নদীর ভাঙনে রামনগর গ্রামের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পরে সরকারিভাবে নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ত্রিমোহনী সেতুর পাশের ২০০ মিটারে কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এখন সেতুটিই হুমকির মুখে। এ ছাড়া ভাঙনের কারণে এই গ্রামের একটি রাস্তাসহ সেতুর সংযোগ সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।"

জাহিদুল ইসলাম, হাবিজার রহমান ও আব্দুল মতিন জানান, কয়েক মাস ধরেই এই এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। রাস্তাটি ভেঙে গেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের সাথে বোনারপাড়া ও কচুয়া ইউনিয়নের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

কচুয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ফরমান আলী বলেন, "ত্রিমোহনী সেতুর দুই পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ড সিসি ব্লক বসিয়েছে। তবে গত সাত বছরেও সেতুর নিচের অংশ বা সংলগ্ন এলাকায় সিসি ব্লক কিংবা জিওব্যাগ না ফেলার কারণে সেখানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।"

কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খন্দকার জানান, সেতু সংলগ্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংযোগ সড়কটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। অন্যদিকে, সাঘাটা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নার্গিস আক্তার জানান, রামনগর গ্রামের ভাঙনের বিষয়টি তিনি তার ঊর্ধ্বতন দপ্তরকে অবহিত করবেন।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া (সুন্দরগঞ্জ) পয়েন্টে পানি ১২ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১২১ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। ঘাঘট নদীর পানি ২১ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৬৩ সেন্টিমিটার এবং করতোয়া নদীর পানি কাটাখালী পয়েন্টে ৬৪ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ২৯৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, নদীভাঙন রোধে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ চলমান রয়েছে।

গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ জানান, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো ইতিমধ্যেই পরিদর্শন করা হয়েছে।