গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্তরগুলো যেন ইসরায়েলের অনুকূলে থাকে, সেই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি গোপন প্রচারণা চালিয়েছে ইসরায়েল। এই প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে বলে দাবি করেছে অলাভজনক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজ।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার প্রধান ব্র্যাড পারস্কেল এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’-এর সঙ্গে ৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের একটি চুক্তি করেছে ইসরায়েলি সরকার। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল চ্যাটজিপিটি, ক্লাউড, জেমিনি ও পারপ্লেক্সিটির মতো জনপ্রিয় এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্তরকে প্রভাবিত করার জন্য একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের এক তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠন ও লবিংয়ের জন্য ইসরায়েল ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই উদ্দেশ্যে তারা ১৭টি নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে। আগে ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের (এফএআরএ) আওতায় এমন নিয়োগ না দিলেও, ২০২৬ সালে এই খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়কারী দেশ হওয়ার পথে রয়েছে ইসরায়েল।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ক্লক টাওয়ার এক্স গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে শত শত বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। প্রযুক্তিগত ভাষায় একে বলা হয় ‘এলএলএম পয়েন্টজনিং’। এর মাধ্যমে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) মূল ডাটাবেজে নির্দিষ্ট বয়ান ঢুকিয়ে দিয়ে চ্যাটবটের উত্তর পরিবর্তন বা ইসরায়েলপন্থি করে তোলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যালিভিয়া, ফ্যাক্টসিগন্যাল ও প্যাক্সপয়েন্ট-এর মতো ওয়েবসাইটগুলোতে সাধারণ মানুষের ভিড় কম থাকলেও এআই সিস্টেমগুলো সহজেই সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে। ড্রপ সাইট নিউজের পরীক্ষায় দেখা গেছে, পারপ্লেক্সিটি ও মাইক্রোসফটের কোপাইলট ইতিমধ্যে ক্লক টাওয়ার এক্স-এর সঙ্গে যুক্ত ওয়েবসাইটগুলোকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।
ড্রপ সাইট যখন পারপ্লেক্সিটিকে প্রশ্ন করে, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক?’, তখন চ্যাটবটটি শুধু ‘হ্যাঁ’ বলে উত্তর দেয়। এই উত্তরের প্রধান উৎস হিসেবে দেখানো হয় পারস্কেল পরিচালিত ওয়েবসাইট ‘অ্যালিভিয়া’কে। মাইক্রোসফট কোপাইলটও একই ধরনের তথ্যসূত্র ব্যবহার করেছে।
এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ‘কমন ক্রল’ ওয়েব আর্কাইভের মাধ্যমে এই তথ্যগুলো ডেটাসেটে প্রবেশ করে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ক্লক টাওয়ার এক্স-এর নিয়ন্ত্রণাধীন অন্তত ১০টি ওয়েবসাইট শত শত বার কমন ক্রল করেছে, যা এআই সিস্টেমে ওই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফ্যাক্টসিগন্যাল নিজেকে ইসরায়েলবিরোধী তথ্য মোকাবিলাকারী ফ্যাক্ট-চেকিং সাইট হিসেবে দাবি করলেও, সেখানে গাজায় নিহত সাংবাদিকদের ‘হামাস সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং ইসরায়েলি অভিযানকে গণহত্যা বলতে অস্বীকার করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্যাক্সপয়েন্ট প্রচার করে যে ‘ইসরায়েল একটি শান্তির দেশ’।
জাস্টোরিয়ামের এক লেখায় দাবি করা হয়েছে, বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমাতে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের চেয়েও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেছে এবং ‘রুফ নকিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েল এই পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে এবং নির্ভুল ছোট অস্ত্রের বদলে প্রায়ই ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ভারী বোমা ব্যবহার করেছে, যা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।
অপতথ্য গবেষকদের মতে, ক্লক টাওয়ার নেটওয়ার্কের ব্লগে এমন কিছু সূক্ষ্ম বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে যা এআই-এর কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। যেমন, ফ্যাক্টসিগন্যাল-এর এক ব্লগে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃত সাংবাদিক ও জঙ্গি সদস্যদের আলাদা করা সব সময় সহজ নয়। তাই সঠিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য সতর্ক তদন্ত ও স্বচ্ছতা জরুরি।’
সোর্স কোড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব লেখার লেখক ইসরায়েলি ডিজিটাল মার্কেটার মার্ক গিন্সবার্গ, যিনি গত মার্চে ইসরায়েলের পক্ষে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত হন। তিনি তার লিংকডইন প্রোফাইলে জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (জিইও) বা এআই চ্যাটবটের উত্তর প্রভাবিত করার দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন। গত জুনে টাইমস অব ইসরায়েলে গিন্সবার্গ লিখেছেন, ইসরায়েলের উচিত এআই প্ল্যাটফর্মে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা।
এ বিষয়ে পারপ্লেক্সিটির মুখপাত্র বিজোলি শাহ ড্রপ সাইট নিউজকে বলেন, ‘পারপ্লেক্সিটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন উৎসের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট লিংকসহ উত্তর পান। এতে তারা চাইলে মূল প্রতিবেদন পড়ে নিজেরাই বিষয়টি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’ তবে মাইক্রোসফটের কোপাইলট ও গুগলের জেমিনি এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ডিজিটাল অপতথ্য প্রতিরোধকারী ফরাসি সংস্থা চেক ফার্স্টের সিইও হার্ভে লেটোকো জানান, এআই ট্রেনিং সিস্টেমে ‘কমন ক্রল’ ডাটাবেজ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি প্রযুক্তিগত দুষ্কৃতকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এআই যখন নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায়, তখন এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলো গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তি বা বয়ান তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়।