ভারতে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) নেতারা ফের আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছেন। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ স্থগিত করার পরও গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি না দেওয়া হলে তারা আবার রাজপথে নামবেন।
কয়েক সপ্তাহের টানা আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগের এই সিদ্ধান্তটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য বড় ধাক্কা বলে উল্লেখ করা হয়। দলটির হিসাবে, মোদির ১২ বছরের শাসনামলে এর আগে মাত্র একজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন।
লাখ লাখ শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা তুলে ধরে দায়বদ্ধতার দাবি জানিয়ে সিজেপি নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ ডাকে। ওই বিক্ষোভে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষও অংশ নেয়; নয়াদিল্লির বাইরে দেশের অন্য স্থানেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর সিজেপির আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। তবে দলটির অভিযোগ, আন্দোলন স্থগিত করার পর দেশজুড়ে ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, মোদি সরকার আশ্বাস দিয়েছিল, এখন বা ভবিষ্যতে কোনো বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এরপরই গত শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
গত সোমবার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না আসতে মোদি সরকারকে সতর্ক করেছে সিজেপি। দলটি বলেছে, পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে বলে তারা খবর পেয়েছে।
সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘সরকার যদি চুক্তিকে সম্মান না করে এবং আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সবাইকে মুক্তি না দেয়, তবে আমরা আবারও আন্দোলন শুরু করতে বাধ্য হব।’
যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসএ) সদস্যরা আলাদা করে বিহারের পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে আন্দোলন নতুন করে শুরু করার হুমকি দিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার বিহার পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারীদের কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। রোববার স্থানীয় সময় ৬টার আগে পর্যন্ত করা সব মামলা প্রত্যাহার করা হবে বলেও ঘোষণা দেয় তারা। আইএসএ বলেছে, আসাম সরকারও মামলা প্রত্যাহার করেছে এবং আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছে।
তবে গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে ‘আপত্তিকর পোস্টার’ প্রদর্শনের অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সোমবার নতুন করে মামলা করেছে। ওই সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। রাজ্যের পুলিশ এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের অধিকাংশই মুসলিম।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত সমাবেশে মোদির একটি কার্টুনচিত্র হাতে ধরে রাখার অভিযোগে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ দায়ের করেছে। ভারতীয় এই নেতাকে নিয়ে একটি ‘আপত্তিকর ছবি’ পোস্ট করার জন্য অন্য একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদিকে গালমন্দ করে দেওয়া পোস্টের ওপর দিল্লি পুলিশ নজরদারি শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ তিনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে ‘আপত্তিকর ভাষা এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য’–সংবলিত পোস্টগুলো সরিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কনটেন্ট চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, শিক্ষা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা এলেও ধর্মেন্দ্রকে মন্ত্রিসভায় রাখতে চেয়েছিল মোদি সরকার—তাতে রাজি হয়নি ‘তেলাপোকারা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজপথের বিক্ষোভের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব ছিলেন। মোদিকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক রিলস ও মিমে ইনস্টাগ্রাম সয়লাব হয়ে যায়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, সরকারবিরোধী সমালোচনা করায় তাদের পোস্টগুলো প্ল্যাটফর্মটি থেকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সিজেপি গত সোমবার বলেছে, পুলিশের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বিক্ষোভকারীদের আইনি খরচ মেটাতে তারা একটি আইনি তহবিল গঠন করেছে। গত মে মাসে ভারতের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ সহিংস দমন-পীড়ন চালায়। এরপর আন্দোলন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী একটি গণ–আন্দোলনে রূপ নেয়।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ভারতের সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।