বান্দরবান সদর উপজেলার লেমুঝিড়ি আগা ঘোনা পাড়ায় পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার পানিতে পৌরসভার বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ায় প্রায় ১০ একরের (১৫ কানি) তিন ফসলি কৃষিজমি সম্পূর্ণ চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা অনিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে দূষিত হচ্ছে প্রাকৃতিক ঝিড়ির পানি এবং বিপর্যস্ত হচ্ছে এলাকার জীববৈচিত্র্য।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের পাশে পৌরসভার ফেলা বর্জ্য বর্ষার পানিতে ধুয়ে নিচে ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ছে। জমিতে প্লাস্টিক, পলিথিন, চিকিৎসাবর্জ্য (ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সুচ, স্যালাইনের ব্যাগ) ও ভাঙা কাচ জমে থাকায় সেখানে কাজ করা এখন জীবনঘাতী হয়ে উঠেছে। কৃষকরা জানান, বর্জ্যের কারণে ঠিকমতো চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রতি বছর তাদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। জমি অনাবাদি হয়ে পড়ায় সংসার চালানো ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় স্থানীয়দের দৈনন্দিন কাজের প্রধান ভরসা ছিল লেমুঝিড়ির স্বচ্ছ পানি। তবে বর্তমানে মেডিকেল বর্জ্য ও প্লাস্টিকের কারণে ঝিড়ির পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। পানির ব্যবহারে চর্মরোগ ও শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ায় গৃহস্থালি কাজে এই পানি ব্যবহার আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন বর্জ্য জমে থাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে ‘লেমুঝিড়ি আপন নগর জ্ঞানদর্শন-বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র’ নামক স্থানীয় বৌদ্ধবিহারেও। বিহারের অধ্যক্ষ জ্ঞানদ্বীপ ভিক্ষু জানান, বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে বিহারে ধ্যান ও প্রার্থনা করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। ময়লার দুর্গন্ধে সেখানে অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিভারী বৃষ্টির সময় পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্য স্তূপ থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে ময়লা ঝিড়ির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ কর্মকর্তা দিদারুল হক চৌধুরী। তার দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি পৌরসভার সীমানার বাইরে হওয়ায় সেখানে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের দায় জেলা প্রশাসনের।
এদিকে বান্দরবান পৌর প্রশাসক এসএম মঞ্জুরুল হক মুক্তকণ্ঠকে জানান, খবর পেয়েই ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমিতে থাকা বর্জ্য কীভাবে দ্রুত অপসারণ করে আবার চাষাবাদের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বর্জ্য দূষণের এই সংকট আরও বিস্তৃত হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এতে দীর্ঘমেয়াদে আরও কৃষিজমি অনাবাদি হতে পারে এবং পানির উৎস ও জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। স্থায়ী সমাধানের জন্য উন্মুক্ত স্থানে মেডিকেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।