যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার করতে চীনের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) ক্রয় করছে ইরান। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান তেহরানে পৌঁছাতে পারে বলে জানা গেছে। ইরান মোট ৪০০টি পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র কেনার পরিকল্পনা করেছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) চুক্তি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই চুক্তিটি যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা কেনাকাটা। পশ্চিমা হামলায় ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় যে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, এই চুক্তির আওতায় চীনের তৈরি ‘কিউডব্লিউ-১২’ এবং ‘এফএন-১৬’ ক্ষেপণাস্ত্রসহ ৩০০ থেকে ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ম্যানপ্যাড) কেনা হবে। হংকংভিত্তিক ঝাংচিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি কোম্পানি এই চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য প্রদান করেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পায়নি। অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, “সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। চীন শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও সংঘাতের অবসানে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা পালন করে আসছে।”
ঝাংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্টের মূল সংস্থা বেইজিংভিত্তিক ঝংছি বাওশাং গ্রুপের কাছে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ইমেইলের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সরবরাহের সময়সূচি ও পরিমাণ পরবর্তীতে পরিবর্তিত হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে পশ্চিম চীনের উরুমকি থেকে আকাশপথে পণ্য সরবরাহ করা হবে এবং তা পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ইরানে যাবে। তবে এই স্থানান্তর আকাশপথে হবে নাকি সড়কপথে, তা স্পষ্ট নয়। পাকিস্তানের সামরিক জনসংযোগ শাখা (আইএসপিআর) এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “চীন থেকে ইরানে বিমান প্রতিরক্ষা অস্ত্র সরবরাহে পাকিস্তানের জড়িত থাকার জল্পনা সম্পূর্ণ মনগড়া ও মিথ্যা।” পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে, সরবরাহ প্রক্রিয়ায় চীন ও ইরান স্থলপথ ব্যবহারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে। একটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তাদের কর্তৃপক্ষ ইরানের কাছে ‘কিউডব্লিউ-১২’, ‘কিউডব্লিউ-১৮’ ও ‘কিউডব্লিউ-১৯’ সিস্টেমসহ কিউডব্লিউ-সিরিজের ম্যানপ্যাড বিক্রির সম্ভাব্য আলোচনা সম্পর্কে অবগত ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইরান ‘কিউডব্লিউ-১২’ ও ‘কিউডব্লিউ-১৮’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চেষ্টা করছিল, তবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি তারা জানত না।
প্রযুক্তিগতভাবে ‘কিউডব্লিউ-১২’ ও ‘এফএন-১৬’ হলো কাঁধে বহনযোগ্য, ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এগুলো মূলত নিচু দিয়ে উড়ন্ত বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। দ্রুত মোতায়েন করা যায় বলে সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় এগুলো কার্যকর।
দুটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্র ও একজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনা সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ স্থানান্তরের ঝুঁকি কমাতে এবং অধিক বিচক্ষণতার সঙ্গে কার্যক্রম চালাতে তেহরান স্থলপথ ব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরান চীনের সঙ্গে জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের জন্য একটি পৃথক চুক্তি সম্পাদনের খুব কাছাকাছি ছিল। তবে সেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।