ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দখল-পাল্টা দখলের ঘটনায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। গত ২৩ জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকায় প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

২০১২ সালে চুয়াডাঙ্গায় উচ্চশিক্ষার প্রসারে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল ‘দ্য ফার্স্ট ক্যাপিটাল এডুকেশন, হেলথ অ্যান্ড এগ্রিকালচার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর মাধ্যমে, যার লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের উন্নয়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুন, সেক্রেটারি ছিলেন প্রফেসর আব্দুল মোতালেব এবং ট্রেজারার ছিলেন আলীম উদ্দিন লস্কর।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের দাবি, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করেন। অভিযোগ করা হয়, ২০১৫ সালে মূল ট্রাস্টের সদস্যদের বাদ দিয়ে ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ট্রাস্ট’ নামে দ্বিতীয় একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল হোতা হিসেবে রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দার টোটনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ট্রাস্টে কেবল পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর করা হয় বলে অভিযোগ।

প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের অভিযোগ, তৎকালীন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় তারা প্রতিবাদ করতে পারেননি। এছাড়া ২০১২ সালে ট্রাস্টের নামে রেজিস্ট্রেশন করা ১৫ বিঘা ৬ শতাংশ জমির দাম ১৬ বছরেও পরিশোধ করেনি বর্তমান দখলদার ট্রাস্টি বোর্ড।

মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউজিসির নীতিমালা উপেক্ষা করে সহকারী রেজিস্ট্রারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবে অপ্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর তার অফিস কক্ষ দখল করে কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দার শান্ত।

দীর্ঘ ১২ বছর পর গত ২১ জুলাই মূল প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিরা পুলিশের সহায়তায় ক্যাম্পাসের দায়িত্ব বুঝে নেন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরাতে নতুন ভিসি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে এর দুই দিন পর, ২৩ জুলাই ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দার শান্ত বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন এবং রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের পাশাপাশি নিজেকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দাবি করে নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দার শান্ত একটি নোটিশ জারি করেন। সেখানে লেখা হয়, ‘অপসারিত হলো ফ্যসিস্ট লস্কর গং। বিশ্ববিদ্যালয় বৈধ (আাগের) ট্রাস্ট-ই চালাবে।’ নোটিশে প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য জেলা বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ধন্যবাদ জানানো হয়।

এই পুনঃদখলের প্রতিবাদে ২৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করেন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রেজারার ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলীম উদ্দিন লস্কর। ইউজিসিতে পাঠানো চিঠিতে তিনি দাবি করেন, ২০১২ সালে গঠিত ‘দ্য ফার্স্ট ক্যাপিটাল এডুকেশন, হেলথ অ্যান্ড এগ্রিকালচার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-ই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত বৈধ পরিচালক, যার মাধ্যমে ২১ জুলাই দায়িত্ব বুঝে নেওয়া হয়েছিল।

আলীম উদ্দিন লস্কর অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালের পর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের স্বাক্ষর স্ক্যান করে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দার টোটন ও নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দার শান্ত একটি ভুয়া ট্রাস্ট গঠন করেন। তারা যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দেড় কোটি টাকার এফডিআর ভাঙিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। তার দাবি, গত ২৩ জুলাই বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে।

আলীম উদ্দিন লস্কর বলেন, ‘আমরা চাই অবিলম্বে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরুক।’

প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ফারুক আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি দখল করে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। আমাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তারা শুধু ক্ষমতার জোরে আবারও প্রতিষ্ঠানটি দখল করতে চাচ্ছে।’

এই বিষয়ে জানতে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো জবাব মেলেনি।