রাজপথ কাঁপানো আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপককে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন এক রূপকথা। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে তিনি পুরো ভারতের যুব আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। সেই লড়াই স্থগিত হওয়ার পর ৩০ বছর বয়সি এই তরুণের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। স্বজনদের কাছ থেকে একের পর এক পাত্রীর প্রস্তাবে যেন ভেসে যাচ্ছেন তিনি। এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তার মা-বাবা নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।

অভিজিতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর বা আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে ছেলেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে চান তার মা অনিতা দীপক। তবে বিয়ের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ও মাসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার পুরোপুরি ছেলের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অনিতা দীপক বলেন, "নিট আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠার আগে অভিজিতের জন্য নানা জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসছিল। আর আন্দোলন শেষে সেই প্রস্তাবের তোড়জোড় যেন আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।"

বোস্টনে থাকার সময় বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই অভিজিৎ কেবল মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়েছিলেন। মা-বাবার ইচ্ছে, ছেলে বাড়ি ফিরলে চূড়ান্ত কাজটা সেরে ফেলা। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলন স্থগিত হলে তার দ্রুত বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে থাকায় তিনি পথেই আটকে গেছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে তার আরও চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

অভিজিতের রাজনৈতিক যাত্রার পেছনে রয়েছে এক ভীতিপ্রদ অন্ধকার অধ্যায়। ককরোচ জনতা পার্টি চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর তার পরিবার বড় হুমকির মুখে পড়ে। বোস্টনে থাকা অভিজিৎকে ফোন করে জানানো হয়, তিনি বিদেশে থাকলেও ভারতে থাকা তার মা-বাবাকে নিশানা করা হবে। বিপদের গন্ধ পেয়ে অভিজিৎ তৎক্ষণাৎ বাবা-মাকে অন্য কোথাও সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

ছেলের নির্দেশ পেয়ে তারা এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে টানা দুই সপ্তাহ আত্মগোপনে থাকেন। পরে জুনের প্রথম সপ্তাহে অভিজিৎ বোস্টন থেকে দেশে ফিরলে স্বজনরা তাকে আনতে যান। বর্তমানে পরিবারটি ছত্রপতি সম্ভাজী নগরের ওয়ালুজ এলাকায় বসবাস করছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, রাজনৈতিক দল খোলা বা আন্দোলন গড়ার পুরো ছকটি পরিবারের কাছে একদম গোপন রেখেছিলেন অভিজিৎ। টিভিতে সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর সংবাদ দেখে প্রথম সব জানতে পারে তার পরিবার।

শান্ত ছেলে থেকে অভিজিতের অপ্রতিরোধ্য সুবক্তা হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে জানা যায়, শৈশবে তিনি ছিলেন বড্ড শান্ত আর লাজুক। বাড়িতে খাওয়া বা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তেমন একটা মুখই ফুটতো না তার। স্কুলেও কখনও আবৃত্তি কিংবা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেখা যায়নি। সেই শান্ত স্বভাবের ছেলেটিই যখন দিল্লির রাজপথে দাঁড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে তিনটি ভাষায় জাতীয় টিভিতে ভাষণ দিতে শুরু করেন, তখন অবাক না হয়ে পারেননি তার মা-বাবা।

তবে কথা কম বললেও হৃদয়ে তার ছিল মানুষের জন্য অপার দরদ। কোভিড-১৯ মহামারীর কঠিন দিনগুলোতে অভিজিৎ ১৫টি গৃহহীন আদিবাসী পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পরিবারের জমানো টাকা ও নিজস্ব রেশন দিয়ে দিনগুলোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।

অভিজিতের শিক্ষাজীবনের মোড় ও গায়ে কালি ছিটানোর ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। সেন্ট আলফোন্সা স্কুল থেকে ১০ম শ্রেণীতে ৯৬ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছত্রপতি সম্ভাজী নগরের এসবি কলেজে পড়াশোনা করেন। তবে দ্বাদশ শ্রেণীতে ৬৫ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পর বাবার পেশার অনুকরণে তাকে জোর করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে নিট আন্দোলনের সময় দিল্লির রাজপথে অভিজিতের ওপর চালানো শারীরিক হামলা এবং গায়ে কালি ছিটানোর সংবাদ টিভিতে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন তার মা। সন্তান রক্তমাংসের মানুষ হয়ে আঘাত পেয়েছে ভেবে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। তবে মাকে ফোনে শান্ত করে অভিজিৎ বলেছিলেন, "মা, তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আমি এখন আর শুধু তোমাদের একার সন্তান নই, আমি তো এখন পুরো দেশের গণসম্পত্তি হয়ে গেছি!"