দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া জামানতবিহীন অতিক্ষুদ্র বা ন্যানো লোনের ক্ষেত্রে খেলাপির হার জামানতসহ ঋণের তুলনায় কম। অনেক ব্যাংকার জামানতসহ ঋণ প্রদানকে নিরাপদ মনে করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার রাজধানীর গুলশানে ‘বাংলাদেশে অর্থায়নের সুযোগ: বেসরকারি খাতের জন্য আরও সহায়ক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।
বৈঠকে ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন জানান, ব্র্যাক ব্যাংকের মোট সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকা জামানতবিহীন ঋণ, যার খেলাপির হার মাত্র ২ শতাংশ। বিপরীতে জামানতসহ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণের খেলাপির হার ৭ শতাংশ।
সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, ‘জামানতসংক্রান্ত বিষয়টি একটি ধারণাগত সমস্যা। ব্যাংক মনে করে, জামানত দিলেই আমি ঝুঁকিমুক্ত বা সুরক্ষিত হয়ে গেলাম। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি তা নয়। জামানত ব্যাংককে তেমন কোনো সুবিধা দেয় না। এটি একধরনের মানসিক প্রশান্তি।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণবৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো বড় ধরনের ঋণবৈষম্য রয়েছে। বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি ঋণসুবিধা পাচ্ছে বৃহৎ করপোরেট খাত। অথচ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
অন্যদিকে, ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, প্রথাগতভাবে ব্যবসায়ীরা ধরে নেন ব্যাংকে গেলেই ঋণ পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের হিসাব খাতা এতই বিশৃঙ্খল থাকে যে তা দেখে কোনো ব্যাংকারের পক্ষে ঋণ অনুমোদন করা কঠিন হয়।
সৃজনশীল অর্থনীতির প্রসারে সহজ শর্তে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। তিনি জামালপুরের হস্তশিল্প বা নকশিকাঁথার মতো আঞ্চলিক উদ্যোক্তাদের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এখনো মোট লেনদেনের ৭২ শতাংশই নগদ লেনদেন। ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট খাতের প্রতিযোগীরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সবার প্রধান শত্রু হলো ‘ক্যাশ’।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বর্তমান প্রবণতা নিয়ে পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান বলেন, খেলাপি ঋণের ধাক্কায় কাবু হয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন মূল ব্যবসায়িক খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে ট্রেজারি বন্ড বা সরকারকে ঋণ দেওয়াকেই নিরাপদ মনে করছে। বর্তমানে বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংকের আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসছে সরকারি বন্ড থেকে। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকঋণ এখনো স্থাবর সম্পদ বা জমিজমার হিসাবেই আটকে আছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্যানেল আলোচক হিসেবে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, শামস জামান, শামস মাহমুদ এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের হেড অব মাল্টিন্যাশনাল হোলসেল ব্যাংকিং আন্দালিব মির্জা। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতের অংশীজনরা এই আলোচনায় অংশ নেন।