কালো সাগরের নীল জলরাশি যেখানে রোমানিয়ার মাঙ্গালিয়া শহরের উপকূল ছুঁয়ে যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। আধুনিক দালানকোঠা ও ইউরোপীয় কোলাহলের মাঝে এসমাহান সুলতান মসজিদ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। এটি রোমানিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা মসজিদ এবং বলকান অঞ্চলের অটোমান স্থাপত্যের একটি দুর্লভ উদাহরণ। ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই মসজিদটি রাজকুমারী এসমাহান (ইসমিহান) সুলতানের উদ্যোগে তৈরি হয়, যিনি অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের কন্যা এবং উজির-এ-আজম সোকোল্লু মেহমেদ পাশার স্ত্রী। মসজিদটির নামও তার নামানুসারে রাখা হয়েছে।
মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে প্রাচীন গ্রিক-রোমান নগরী কাল্লাটিসের ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগৃহীত বিশাল পাথর। দক্ষ কারিগররা এসব পাথর নিখুঁতভাবে কেটে স্থাপন করেছেন, যাতে ভবনটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকে। সেই সময়ের প্রকৌশল দক্ষতার নিদর্শন হিসেবে পাথরের ব্লকগুলোকে ধাতব সংযোগের মাধ্যমে আরও মজবুত করা হয়েছিল।
মসজিদের পাশে অবস্থিত ডব্রুজা অঞ্চলের প্রাচীন মুসলিম কবরস্থানে ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো অসংখ্য সমাধিফলক রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোতে উসমানীয় তুর্কি ভাষায় খোদাই করা শিলালিপি দেখা যায়।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এসমাহান সুলতান মসজিদ বলকান অঞ্চলের ধ্রুপদী অটোমান ঘরানার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর মূল নামাজ-ঘরটি বর্গাকৃতির এবং ছাদের কাঠামোতে শক্ত ও টেকসই ওক কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। মিনারটি উত্তর-পশ্চিম কোণে দাঁড়িয়ে আছে, যার ভেতরে একটি সর্পিল সিঁড়ি রয়েছে।
মসজিদের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক নেই, বরং পাথরের স্নিগ্ধতা, কাঠের প্রাচীন ঘ্রাণ এবং ঐতিহ্যবাহী কার্পেটের সৌন্দর্য মসজিদের সরল সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তোলে।
কমিউনিস্ট শাসনের শেষদিকে এবং পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদটির কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় ও ইতিহাসপ্রেমীদের উদ্বেগের পর, রোমানিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক ও সংস্কৃতি সংস্থার তত্ত্বাবধানে এবং তুরস্কের সহযোগিতায় মসজিদটির সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়।
বর্তমানে এসমাহান সুলতান মসজিদ ডব্রুজা অঞ্চলের তুর্কি ও তাতার মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় এবং রোমানিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে আসেন।
সময়ের চাকা ঘুরে গেছে, সুলতানদের শাসন নেই, রাজকন্যারা ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছেন। কিন্তু মাঙ্গালিয়ার বুকে এসমাহান সুলতান মসজিদ আজও দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য শান্ত সৌন্দর্য নিয়ে। এটি প্রমাণ করে—ইতিহাস ও স্থাপত্য কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে যেতে পারে।