আমাদের চারপাশের উদ্ভিদজগতে প্রতিনিয়ত নানা অদৃশ্য পরিবর্তন ঘটে। প্রাকৃতিক নিয়মে পুরোনো পাতা ঝরে নতুন পাতা গজায়, আর নির্দিষ্ট সময়ে ফুল ফুটে ফলে পরিণত হয়। আপাতদৃষ্টিতে বিশৃঙ্খল মনে হলেও তরুজগতের এই কর্মকাণ্ড মূলত রীতিবদ্ধ। তবে এই নিয়মের মাঝেও কিছু ব্যতিক্রম চোখে পড়ে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ফুলের রং বদলানোর স্বভাব। অনেক সময় একই গাছে ভিন্ন রঙের ফুল দেখে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও, এটি আসলে প্রকৃতির এক বিশেষ কৌশল। এমন ব্যতিক্রমী দুটি ফুল হলো উলটচণ্ডাল ও ব্রুনফেলসিয়া।

উলটচণ্ডাল সাধারণত শালবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, অন্যদিকে ব্রুনফেলসিয়া একটি আবাদিত উদ্ভিদ। উলটচণ্ডাল লতানো প্রজাতির হলেও ব্রুনফেলসিয়া গুল্মশ্রেণির গাছ, যা তার সুগন্ধের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

উলটচণ্ডাল (Gloriosa superba) গাছটির আদি আবাস বাংলাদেশ ও ভারত। দেশের ভেতরে ঢাকার পাশাপাশি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগায় শালবনের ভেতর এবং মধুপুর বন ও উপকূলীয় অঞ্চলেও এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। তবে বর্তমানে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল অরক্ষিত হয়ে পড়ায় অনেক গাছ নগর উদ্যানে আশ্রয় নিয়েছে। সংখ্যার স্বল্পতার কারণে অনেকে একে ভিনদেশি উদ্ভিদ বলে মনে করেন। ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বাগান এবং বলধা গার্ডেনে এই ফুল বিক্ষিপ্তভাবে দেখা যায়। চমৎকার ঔষধি গুণের জন্য এই গাছটি বেশ আদৃত।

লতানো এই গাছের পাতার আগা আকর্ষীতে রূপান্তরিত, যার মাধ্যমে এটি আশ্রয়ে বেয়ে ওঠে। এর পাতা লম্বা, বোঁটাহীন এবং বিন্যাস বিপ্রতীপ। গ্রীষ্মের শেষে ও বর্ষায় এই গাছে এক বা একাধিক গন্ধহীন ফুল ফোটে। শুরুতে হলুদ রঙের এই ফুলগুলো পরবর্তীতে কমলা বা লালচে হয়ে ওঠে। ছয় সেন্টিমিটার লম্বা পাপড়িগুলো ওপরের দিকে ওলটানো এবং কিনারা কুঁচকানো থাকে। শরতে শুকিয়ে শীতকালে গাছটি মারা গেলেও গ্রীষ্মে গুচ্ছমূল থেকে পুনরায় নতুন চারা গজায়। বর্তমানে এই উদ্ভিদটি বিপন্ন তালিকায় রয়েছে।

অন্যদিকে, ব্রুনফেলসিয়া (Brunfelsia calycina) দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল থেকে অনেক আগে বাংলাদেশে এসেছে। এই ফুলটির কোনো নির্দিষ্ট বাংলা নাম নেই, তবে ইংরেজিতে এটি 'ইয়েস্টারডে, টুডে ও টুমরো' নামে পরিচিত। বর্ণবৈচিত্র্য ও স্নিগ্ধ সৌরভের কারণে এটি বর্তমানে বাগান, রাস্তার পাশে এমনকি টবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই গাছের সতেজ ফুলের রং বেগুনি, যা কয়েক দিনের ব্যবধানে সাদা হয়ে যায়। একই সময়ে গাছে দুই রঙের ফুল সতেজ থাকায় কেউ কেউ একে 'সুষমা' নামেও ডাকেন।

ঝোপাল এই গাছটি এক থেকে দুই মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর মসৃণ ও গাঢ় সবুজ পাতাগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় সেন্টিমিটার লম্বা হয়। শীতের শেষভাগে পাতা ঝরে গেলেও গ্রীষ্মে পাতাহীন গাছে অজস্র বেগুনি ফুল ফোটে, যার প্রস্থ আড়াই থেকে তিন সেন্টিমিটার। গ্রীষ্ম থেকে শরৎকাল পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস এই গাছে প্রচুর ফুল ফোটে এবং তপ্ত বাতাসে এর সুবাস বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে।