পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে আসা শরণার্থীদের জন্য নির্ধারিত এই আসনগুলো বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংবিধান সংশোধন না করে এই আসনগুলো বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং দীর্ঘদিনের বিক্ষোভের মধ্যেই অঞ্চলটিতে ৪৫ আসনের আইনসভা নির্বাচন তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে যথাসময়ে ভোট সম্পন্ন হচ্ছে। আগামী ২ আগস্ট মুজাফফরাবাদ বিভাগ এবং শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনে ভোট হবে। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ পুঞ্চ বিভাগে ভোটগ্রহণের তারিখ ১০ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত জুনের শুরু থেকে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, ধর্মঘট ও অবস্থান কর্মসূচির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রায় দুই সপ্তাহ ব্যাংক সেবা বন্ধ ছিল এবং অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ এখনো সীমিত বা বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী পুঞ্চ বিভাগে অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে আটা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আন্দোলনকারী সংগঠন জেএসিসি-কে গত ৫ জুন স্থানীয় সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তাদের অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন অথবা আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ রাওয়ালাকোটে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। শুরুতে ভর্তুকি মূল্যে আটা, স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুবিধায় স্থানীয়দের অংশীদারিত্বের দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তীতে তা ৩৮ দফা দাবিতে রূপ নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি হলো শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা।
আইনসভার মোট ৪৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টি আসনে স্থানীয় ভোটাররা ভোট দেন এবং বাকি ১২টি আসন সংরক্ষিত। এই সংরক্ষিত আসনের ভোটাররা মূলত লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি ও শিয়ালকোটসহ পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেন। এ বছর এই ১২ আসনের জন্য নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার। জেএএসি-র দাবি, যারা ওই অঞ্চলের বাইরে বসবাস করেন, তাদের জন্য আসন রাখা গণতান্ত্রিকভাবে অযৌক্তিক।
তবে এই দাবির বিরোধিতা করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি চৌধুরী মুহাম্মদ ইব্রাহিম জিয়া। তার মতে, শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্বের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে, যা ১৯৪৭ সালের পর থেকে বিভিন্ন আইন ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। গত জুনে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সুপ্রিম কোর্টও জানিয়েছিল, এই ১২টি আসন সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত, তাই নির্বাহী আদেশ বা জনচাপের মাধ্যমে তা বাতিল করা সম্ভব নয়; এর জন্য আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন। সাবেক প্রধান বিচারপতি জিয়া আরও উল্লেখ করেন, নতুন আইনসভা নির্বাচিত হওয়ার আগে এমন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ নেই।
সরকারও একই অবস্থানে অনড়। মুখ্যমন্ত্রী ফয়সাল মুমতাজ রাথোর বলেছেন, "১২টি আসন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল নির্বাচিত আইনসভার প্রতিনিধিদের রয়েছে।" পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, আসনগুলোর ভবিষ্যৎ ভোটারদের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত, রাস্তার আন্দোলনের চাপে নয়।
নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে জেএএসি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক কেবল নির্বাচনী ব্যবস্থার নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন এবং পাকিস্তানের সামগ্রিক কাশ্মীর নীতি। সমালোচকদের অভিযোগ, মুজাফফরাবাদের নির্বাচিত নেতৃত্বের ক্ষমতা সীমিত এবং অঞ্চলটির রাজনীতিতে পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা কাঠামোর প্রভাব প্রবল। কানাডাভিত্তিক গবেষক এরশাদ মাহমুদের মতে, স্থানীয় নেতৃত্বের জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা নেই।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের অবস্থান হলো, শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্ব ঐতিহাসিকভাবে বৃহত্তর কাশ্মীরের দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই ১২টি আসনের মাধ্যমে পাকিস্তান পুরো জম্মু ও কাশ্মীরের প্রতিনিধিত্বের দাবি ধরে রাখতে চায়। ১৯৪৯ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের চূড়ান্ত মর্যাদা নির্ধারণের কথা থাকলেও প্রায় ৮০ বছর ধরে তা অমীমাংসিত। এই জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বর্তমান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা অঞ্চলটির গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।