দিনের আলোয় খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বড়বাড়ি গ্রামের বুরুজপোতা ঢিবির কাছে পৌঁছালেই বোঝা যায়, জায়গাটি এখনো ঘিরে আছে একধরনের নিস্তব্ধতা। চারদিকে বিশাল গাব, কাঁঠাল ও বাঁশঝাড়ের ঘন ছায়া। উঁচু মাটির ঢিবিটি গাছের শিকড়ে ঘেরা, আর পাশে দেখা যায় ছোট্ট একটি মনসামন্দির। স্থানীয়দের মতে, এই নীরবতার আড়ালেই রয়েছে কয়েক শ বছরের ইতিহাস।

স্থানীয়রা বুরুজপোতা ঢিবিটিকে রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গের অংশ হিসেবে চেনেন। ইতিহাসবিদদের লেখাতেও এ ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢিবিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নিলেও জমির মালিকানা–সংক্রান্ত জটিলতায় প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, বড়বাড়ি গ্রামের মূল সড়ক থেকে একটু ভেতরে বাঁশঝাড় পেরিয়ে ঢিবির অবস্থান। রাস্তার সমতল থেকে ঢিবিটির উচ্চতা এখনো প্রায় ১০–১২ ফুট। ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল গাব ও কাঁঠালগাছ। গাছের শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে পুরোনো ইটের অংশও দেখা যায়।

ঢিবির ছবি তুলতে দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা মধুমিতা রানী। তিনি হাসিমুখে প্রশ্ন করেন, ‘ঢিবির ওপরের পুরোনো গাছের ছবি তুলছেন নাকি?’ এরপর তিনি নিজেই ঢিবির বিষয়ে কথা বলেন। মধুমিতা রানী জানান, একসময় ঢিবিটি আরও অনেক উঁচু ছিল। বছরের পর বছর বৃষ্টির কারণে ক্ষয় এবং মানুষের মাটি কাটার ফলে তা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে গেছে। পাশের মনসামন্দিরটির দিকেও ইশারা করে তিনি বলেন, এটিও বহু প্রাচীন।

কথা বলতে বলতে মধুমিতা রানী ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাব ও কাঁঠালগাছ দুটির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, গাছ দুটির বয়স ১৫০ বছরেরও বেশি। তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে শুনেছি, এটা রাজা প্রতাপাদিত্যের আমলের বুরুজ। এখানে নাকি রাজার সৈন্যরা পাহারা দিত, কামানও ছিল।’

স্থানীয়দের মুখে মুখে আরও কিছু কাহিনি ঘোরে। গাবগাছকে কেন্দ্র করে একটি লোকবিশ্বাসও রয়েছে এলাকায়। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে ঝড়ে গাছটি কাত হয়ে পড়েছিল। পরে সেটি কেটে ফেলার উদ্যোগ নিলে কয়েকজন স্বপ্নে দেখেন, তাঁদের গাছটি কাটতে নিষেধ করা হচ্ছে। এরপর গাছটি আর কাটা হয়নি এবং ধীরে ধীরে সেটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা।

ঢিবি থেকে কয়েক শ গজ দূরের বড়বাড়ি গ্রামেও ইতিহাসের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় বা চাষের জমিতে এখনো প্রাচীন ইট, নকশাখচিত পাথর এবং পুরোনো স্থাপনার ভগ্নাংশ দেখা যায়। কোথাও ছোট আকারের পুরোনো ইট স্তূপ করে রাখা আছে, কোথাও পড়ে আছে খোদাই করা পাথর। কিছু পাথরে এখনো স্পষ্ট ফুল-লতাপাতা, দেব-দেবীর অবয়বসহ বিভিন্ন অলংকারের নকশা দেখা গেছে।

গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, মাটি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে পুরোনো আমলের ইট, খোদাই করা পাথর, এমনকি কখনো কখনো ইটের গাঁথুনিযুক্ত দেয়ালের অংশও। গ্রামের অলিগলি, বাড়ির আঙিনা বা পুকুরপাড়ে হাঁটলেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই ঐতিহাসিক চিহ্ন চোখে পড়ে।

একসময় বড়বাড়িজুড়ে রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গের নানা চিহ্ন ছিল বলেও জানান স্থানীয়রা। শীলপুকুর, পদ্মপুকুর, দুই সতিনের পুকুর, দুর্গের পরিখা ও প্রাচীরের অনেক অংশ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। তবুও তাঁদের কাছে বুরুজপোতা ঢিবিকেই এখনো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে মনে করা হয়।

স্থানটির সঙ্গে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দা মনোরঞ্জন মণ্ডল বলেন, আইলার সময় নদীর বাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চারপাশের সব জায়গা পানির নিচে চলে গেলেও ঢিবি ডোবেনি। কয়েক দিন ধরে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বহু মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বুরুজপোতা ঢিবির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র। তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে শাঁকবাড়িয়া নদীর পশ্চিম তীরে বেদকাশী এলাকায় রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গ, প্রাচীর, পরিখা ও বিভিন্ন স্থাপনার ভগ্নাবশেষের উল্লেখ রয়েছে।

‘কয়রা উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ বইয়ে ইতিহাস গবেষক ও কয়রা কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আ ব ম আবদুল মালেক লিখেছেন, মোগল আমলে বারভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী শাসক রাজা প্রতাপাদিত্য আনুমানিক ১৫৮৭ থেকে ১৫৯৫ সালের মধ্যে এখানে দুর্গ নির্মাণ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বুরুজপোতা ঢিবি ছিল দুর্গের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ। এখান থেকে সৈন্যরা চারদিকে নজরদারি করতেন এবং প্রয়োজন হলে তোপধ্বনির মাধ্যমে সংকেত দিতেন।

স্থানটি সংরক্ষণে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি প্রশাসন প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত পাঠিয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর বেদকাশী মৌজার এসএ ২০৫২ নম্বর দাগের জমিতে অবস্থিত ঢিবিটি এখনো রাস্তার সমতল থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু। ঢিবির ওপর উঠলে এটি প্রাচীন পুরাকীর্তির নিদর্শন বলে মনে হয়।

খুলনা বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান শাহিন মিয়া জানান, সম্প্রতি বুরুজপোতা ঢিবি পরিদর্শন করে উপজেলা ভূমি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঢিবিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মধ্যে রয়েছে। জমির মালিকেরা এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে দিতে রাজি হননি। তাঁর ভাষ্য, ‘ভূমির মালিকদের সম্মতি না থাকলে আমাদের পক্ষে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া কঠিন।’

গাছের শিকড়ে ঢাকা বুরুজপোতা ঢিবিটি যেন এখনও নীরবে অপেক্ষা করছে। স্থানীয়দের আশা, একদিন যথাযথ উদ্যোগ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে উঠে আসতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের আরও অজানা অধ্যায়।