পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাওয়ালাকোটে নির্বাচনকে সামনে রেখে চলা সংঘাতে নিহতদের মধ্যে নাকাশ জারদাদও রয়েছেন। শিক্ষা বিভাগের ওই কর্মী ওই এলাকায় একটি মহিষের খামারে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কাছাকাছি সময়ে সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
জারদাদের খামারের চারপাশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি বাড়ি ফিরতে পারেননি। একপর্যায়ে গোলাগুলিও শুরু হয়। এরপর একটি গুলি এসে ৩০ বছর বয়সী জারদাদের গায়ে লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন তাঁর চাচা আলতাফ হোসেন।
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আইনসভা নির্বাচনের আগে এই সহিংসতায় মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ৪০। এর মধ্যে ৩৪ জন ছিলেন বিক্ষোভকারী এবং বাকি ছয়জন পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য।
সহিংসতা নিয়ে দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধিকারকর্মী গোষ্ঠীগুলোর জোট জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) লংমার্চ ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে।
জেএএসি জানায়, তাদের লক্ষ্য পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য স্থানীয় আইনসভায় বরাদ্দ ১২টি আসন বাতিলের দাবি। কয়েক দশক আগে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে আসা শরণার্থীদের জন্য এই আসনগুলো বাতিলের আহ্বান জানালেও সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ করে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে। তবে জেএএসি বলছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।
শরণার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক
আইনসভার ৫৩টি আসনের মধ্যে সংরক্ষিত ১২টি আসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। ওই আইনসভায় ৩৩টি আসনে সরাসরি ভোট হয়। আরও আটটি আসন নারী ও অন্যদের জন্য সংরক্ষিত।
বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরিদের জন্য এই আসনগুলো বরাদ্দের নিয়ম চালু হয় ১৯৭০-এর দশকে। তখন ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে এসে বসতি গড়েছিলেন—এমন মানুষের জন্য এই আইন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, দীর্ঘদিনের বিরোধ মিটলে একদিন তাঁরা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন; একই সঙ্গে ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থায় যেন তাদের কথা বলার সুযোগ থাকে, তা নিশ্চিত করাও।
তবে যাঁদের জন্য আসনগুলো সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, তাদের অনেকেই পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা চাইলেও এসব আসনে নির্বাচন করতে পারেন না—এমন একটি অবস্থার কথা বলা হচ্ছে।
জেএএসি সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, এর ফলে স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আইনসভার সব আসন ওই অঞ্চলে বসবাসকারীদের জন্য হওয়া উচিত বলেও তারা মনে করে।
অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, আসন সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যক এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেই। তবে নির্বাচন হবে তিন ধাপে; প্রথম ধাপ শুরু হবে ২৭ জুলাই।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বলা হচ্ছে, ২০২১ সালের সর্বশেষ আইনসভা নির্বাচনে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। যদিও ২০২২ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হয়। এর পর থেকে এই অঞ্চলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে। এবারের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকে বলা বেশ কঠিন।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানে আজাদ জম্মু–কাশ্মীর (এজেকে) হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট পদবি ব্যবহার করেন।
ঘরোয়া সমাবেশ ও প্রকাশ্যে সহিংসতা
নির্বাচনের আগে বিবিসির সাংবাদিকেরা প্রাদেশিক রাজধানী মুজাফফরাবাদ ঘুরে দেখে জানান, সেখানে উত্তেজনা ও ভয়ের পরিবেশ স্পষ্ট। বেশির ভাগ মানুষই নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। কারও কারও মধ্যে ভয় ছিল—নির্বাচন বা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর পক্ষে কথা বললে জেএএসি তাঁদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বা ‘দালাল’ তকমা দিতে পারে।
অন্যদিকে জেএএসিকে সমর্থন করেন—এমন অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাতে হয়রানির আশঙ্কায় ছিলেন। পরিস্থিতির মধ্যে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। প্রার্থীদের গাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনাও হয়েছে—এসব ঘটনার জন্য জেএএসিকে দায়ী করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ফলে প্রার্থীরা খুব নীরবে ও সীমিত পরিসরে প্রচার চালিয়েছেন। রাজনৈতিক সমাবেশগুলোও ঘরোয়া বা রাস্তার মোড়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেকেই মন্তব্য করতে চাননি।
পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) একমাত্র নারী প্রার্থী নরিন আরিফ বিবিসিকে বলেন, জেএএসির বিক্ষোভের কারণে তিনি জনসমাবেশের বদলে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রাজনৈতিক বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিরোধী দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা সরদার মুখতার খান বলেন, তরুণদের কাছে জেএএসির বিক্ষোভ ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ কারণে ‘সীমিত পরিসরে প্রচার’ চালানো ছাড়া তাঁরও আর কোনো উপায় ছিল না।
এই প্রার্থী বিবিসিকে বলেন, ‘একজন নির্বাচনী প্রার্থীকে তাঁর এলাকার মানুষের মনোভাব বুঝেই চলতে হয়।’
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে এবারের চিত্র আলাদা ছিল। প্রচারের একদম শেষ সপ্তাহে এসে পিপিপি ও পিএমএল-এন নেতারা এই অঞ্চলে সমাবেশ করেছেন। তবে থমথমে পরিবেশ ও সীমিত প্রচার সত্ত্বেও নির্বাচন আয়োজনের দিকে এগিয়ে যাওয়াকেই ‘একমাত্র সমাধান’ মনে করছেন পাকিস্তানের কাশ্মীরবিষয়ক মন্ত্রী আমির মুকাম।
আমির মুকাম বিবিসিকে বলেন, ‘জনগণ যাঁকে ভোট দেবে, তাঁরই ক্ষমতায় আসা উচিত এবং তাদের ভবিষ্যৎ ও নিয়তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এই ক্ষমতা কেবল কয়েক শ বা কয়েক হাজার মানুষের হাতে থাকা উচিত নয়; কাশ্মীরে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষেরই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত তাঁরা কাকে ক্ষমতায় আনতে চান।’
এদিকে এই অঞ্চলের ভেতরেও এমন কিছু মানুষের মত রয়েছে—এখন ভোট করার সঠিক সময় নয়। মুজাফফরাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান জাহিদ আমিন মনে করেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ‘সেটার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না’।
তদন্তের দাবি বাড়ছে
সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৭ জুলাই জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক নিহতদের প্রসঙ্গে ‘এ সহিংসতায় নিহত বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য—সবার মৃত্যুর ঘটনায় অবিলম্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের’ আহ্বান জানান। তিনি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিতেও সমালোচনা করেন। টুর্ক বলেন, ‘নাগরিক সমাজের একটি সংগঠনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা মানুষের মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে।’
সহিংসতার দায় নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ভারত ‘কয়েক দশকের কাঠামোগত শোষণ ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করাকে’ দায়ী করেছে। দুই প্রতিবেশী দেশই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করলেও বাস্তবে তারা কেবল কিছু অংশ শাসন করে। ভারতের অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তান ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে—যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো ভারতের বিবৃতি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতির একটি ‘সোহার্দ্যপূর্ণ’ সমাধান দেখতে চান তিনি। বিলাওয়াল একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের আহ্বান জানান। জেএএসি ও সরকার—উভয়েরই দোষ রয়েছে উল্লেখ করে সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকারও অনুরোধ জানান তিনি।
এছাড়া বিবিসি উর্দুকে পিপিপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘মুঠোফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। ৪০ দিন হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারি যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে সাময়িক বিধিনিষেধের দরকার হতে পারে। কিন্তু পুরো অঞ্চলে টানা ৪০ দিন ইন্টারনেট না থাকাটা গোটা জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার বার্তা দেয়।’