যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সস্তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে রেকর্ড বিনিয়োগ করেছে চীন।
চীনের বৈদেশিক অবকাঠামো কর্মসূচি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বছরের প্রথম ছয় মাসে সবুজ জ্বালানি খাতে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ২ হাজার ১০ কোটি ডলারে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড ও সাংহাইভিত্তিক গ্রিন ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিআরআইয়ের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে চুক্তির পরিমাণ ২০২৫ সালের পুরো বছরের চেয়েও বেশি। এর মধ্যে নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৮০ কোটি ডলার এবং বিনিয়োগ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ৮৩০ কোটি ডলার।
ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের চীনবিষয়ক জ্বালানি ও অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফ নেডোপিল ওয়াং বলেন, "তুলনামূলক কম ব্যয়ের কারণে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে চীনের বিনিয়োগ অব্যাহত আছে। এখন যেসব দেশ চীনের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্পে কাজ করছে, তারা ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দামের অস্থিরতা কমে যাওয়ার সুফল পেতে পারে।"
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিআরআইয়ের মোট চুক্তির পরিমাণ রেকর্ড ১২৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৩৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিনিয়োগ ছিল ৪৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৯৮০ কোটি ডলার এবং নির্মাণ প্রকল্প ছিল ৭৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার। জ্বালানি খাতের পাশাপাশি প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প এবং ধাতু ও খনিজ খাতেও অর্থায়ন বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার ফলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারে বিদ্যুৎ ও ডেটা সেন্টারের চাহিদা বাড়ায় বিআরআইয়ের আওতায় চীনের বিনিয়োগ গতি পেয়েছে। একই সময়ে চীনের সরকারি শুল্ক তথ্যেও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে।
২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বিআরআই চালু করেন, যা উন্নয়নশীল বিশ্বে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত। গত সপ্তাহে সি চিন পিং এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনকে গড়ে তুলতে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
গবেষকদের মতে, বিআরআই এখন আগের চেয়ে বেশি বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিআরআই কার্যক্রমে বেসরকারি অংশীদারত্বের হার বেড়ে ৪৮ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের চায়না ক্লাইমেট হাবের পরিচালক লি শুও বলেন, "বিআরআইয়ের নতুন ধাপে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এখন আর রাষ্ট্রীয় নির্দেশনায় নয়; বরং বাণিজ্যিক বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।"
তবে ঋণচুক্তির অস্বচ্ছতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋণের বোঝা তৈরি হওয়া নিয়ে বিআরআই-এর সমালোচনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আফ্রিকার দেশগুলোর আগ্রহ কমেনি; সেখানে বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান ও রাশিয়ায় নতুন কোনো প্রকল্প ঘোষণা না করায় সেখানে বিনিয়োগ কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ক্রিস্টোফ নেডোপিল ওয়াং বলেন, "ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে দেশটিতে বিআরআইয়ের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রনির্ভর প্রকল্প থেকে বেসরকারি বাণিজ্যিক বিনিয়োগে রূপান্তর ঘটাতে মস্কো ও বেইজিং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।"
নেডোপিল আরও বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে বিআরআইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পাকিস্তান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।" একই সময়ে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে মনে করা হচ্ছে।