হেপাটাইটিস বি ও সি অনেক ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গ ছাড়াই বছরের পর বছর শরীরে অবস্থান করে। তাই রোগের লক্ষণের জন্য অপেক্ষা না করে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের মতো মারাত্মক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, টিকাদান, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসাসেবা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংক্রমণের হার কমিয়ে আনা সম্ভব।

আগামী মঙ্গলবার বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে আজ রোববার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলনকক্ষে এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ ও মুক্তকণ্ঠের যৌথ আয়োজনে এবং বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সায়েন্টিফিক পার্টনারশিপে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়, যার মূল লক্ষ্য হলো ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। বৈঠকে জানানো হয়, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত।

বৈঠকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এরশাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, "অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি জানেন না যে তাঁরা হেপাটাইটিস বি বা সি বহন করছেন। তাই যত দ্রুত রোগ শনাক্ত করা যাবে, তত দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে হেপাটাইটিস নির্মূল সম্ভব।"

হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, গত কয়েক বছরে হেপাটাইটিস বি ও সি চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, "হেপাটাইটিস সি এখন আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ওষুধে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে কোন রোগীর কখন চিকিৎসা শুরু হবে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা উচিত।"

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক বিনয় পাল সতর্ক করে বলেন, শুধু লিভার ফাংশন টেস্টের মাধ্যমে হেপাটাইটিস শনাক্ত হয় না। তিনি বলেন, "এইচবিএসএজি, অ্যান্টি–এইচসিভি, প্রয়োজনে ভাইরাল ডিএনএ বা আরএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে হয়। পরিবারের সদস্য আক্রান্ত থাকলে, ডায়ালাইসিস রোগী, গর্ভবতী নারী—তাঁদের অবশ্যই স্ক্রিনিং করানো উচিত।" একই সঙ্গে তিনি আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।

প্রতিরোধের উপায় নিয়ে অধ্যাপক এস এম আলী হায়দার বলেন, "হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে এই টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নতুন প্রজন্ম সুরক্ষা পাচ্ছে। তবে যাঁরা আগে টিকা নেননি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, ডায়ালাইসিস রোগী ও আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।" তিনি আরও জানান, হেপাটাইটিস সির কোনো টিকা নেই, তাই নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের বিকল্প নেই।

সমাজিক ভুল ধারণা প্রসঙ্গে সহযোগী অধ্যাপক মোস্তফা নূর মহসীন বলেন, "অনেকেই মনে করেন, একসঙ্গে খাওয়া, করমর্দন বা একই বাসায় বসবাসের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায়। বাস্তবে এসবের মাধ্যমে রোগটি সংক্রমিত হয় না। ভুল ধারণার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বৈষম্যের শিকার হন। রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণাকে দূর করতে হবে।"

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাদ্য এবং হাত ধোয়ার অভ্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিশেষ করে হেপাটাইটিস এ ও ই প্রতিরোধে নিরাপদ পানির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও টিকাদানের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

উপাধ্যক্ষ আবদুর রব বলেন, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যমের সহযোগিতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

সিএসসিআরের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট শামীম বকস বলেন, "হেপাটাইটিস বি ও সি–কে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন এই ভাইরাস শরীরে থাকলে ধীরে ধীরে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হয় এবং একসময় লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ নিশ্চিত করা গেলে এসব জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।"

বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন চমেক হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান মো. আবদুল কাদের, চট্টগ্রাম মা–শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ ইউসুফ, চমেকের বিশেষজ্ঞ মো. তাসবীরুল হাসান, আবদুল মুমিন, সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ফয়সাল এবং বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের মহাব্যবস্থাপক দেবাশীষ সাহা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্তকণ্ঠের যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী।