চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার—যা সমপরিমাণ ৬ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে পণ্য খাতে লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
আজ রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির নেতৃত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ সংক্রান্ত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এ সময় বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ এবং প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতের সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার মোট ৬৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ ৬ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতের জন্য ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এবার মোট রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে ১০ কোটি ডলার।
তবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, গত অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রপ্তানি হয়নি এবং বছর শেষে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ব্যবসায় সহায়ক পরিবেশ, ব্যবসা সহজ করা এবং রপ্তানি গন্তব্যের দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে প্রকৃত রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। যত রপ্তানি হয়েছে, সেখান থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে নতুন অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমে ৪৮ বিলিয়ন অর্থাৎ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। সেবা খাত থেকে সাত বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। তবে তিনি জানান, সেবা খাতের রপ্তানি আয়ের হিসাব চূড়ান্ত হয়নি; এ জন্য আরও দুই থেকে তিন মাস লাগবে।
রপ্তানি আয়ে সাম্প্রতিক মন্দা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গত দুই অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে একধরনের মন্দা ছিল। দুটি যুদ্ধের প্রভাবে উন্নত দেশে ভোগের পরিমাণ কমেছে, ফলে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়েছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পাঁচ-ছয়টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হবে। পাশাপাশি প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গেও এফটিএর আলোচনা শুরু হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে তিনি বলেন, পোশাকশিল্প থেকে রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ আসে—যা কোনো দেশের জন্যই স্বস্তিকর নয়। এই বাস্তবতায় সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে রপ্তানি বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দেখা যাবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই তৈরি পোশাক খাত থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হোক। পাশাপাশি অন্যান্য খাত থেকেও রপ্তানি আয় বাড়ুক, যাতে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচিত সরকারের নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব সংস্কার, নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলে আগামী অর্থবছরে নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। ব্যবসা সহজীকরণ, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা দেশের রপ্তানি খাতে নতুন এক ঊর্ধ্বগতির সূচনা করতে চাই।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের নামের পরিবর্তন হলেও শুল্কের হারের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের ১০ শতাংশ শুল্কই নতুন আইনি কাঠামোর অধীন বহাল আছে। ফলে রপ্তানিতে নতুন করে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
জ্বালানিসংকট–সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের মাটির নিচ থেকে যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে সেটি আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। আর ৯০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হচ্ছে। রাতারাতি জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
জাপানের সঙ্গে করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কবে থেকে কার্যকর হবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি চুক্তি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে হয়। জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে জাপানের সঙ্গে করা চুক্তিটি উপস্থাপন করা হবে। এরপর সেটি কার্যকর হবে।