ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেন্টাগনের কাছে থাকা প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, ইরানে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর আগে বেশ কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যার মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন, যার পর তাঁর কৌশলে এই পরিবর্তন আসে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি।

অভ্যন্তরীণ আলোচনায় পেন্টাগনের আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত কমে আসার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, গত শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এতে তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন।

বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি বলেন, "ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে প্রায় কেউই সামরিক অভিযান আরও জোরদারের পরিকল্পনাকে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করেননি।"

যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন যে, ইরানে বড় ধরনের অভিযান চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। তবে জেনারেল কেইন প্রেসিডেন্টকে ঠিক কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর মুখপাত্র মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, “প্রেসিডেন্ট সব সময়ই বলে আসছেন যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে ‘‘সন্ত্রাসী’’ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তিনি সব ধরনের বিকল্প উপায়ের কথা মাথায় রাখবেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বারবার সামরিক হামলার পর ইরানের জন্য আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করাটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। না হলে কী ঘটতে পারে, তা তারা ভালোভাবেই জানে।”

গত দুই সপ্তাহে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দোটানায় রয়েছেন।

"প্রায় পাঁচ মাস ধরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যে যুদ্ধ চলছে, সেটিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, বিশেষ করে কীভাবে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যাবে—এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দোটানায় আছেন। গত দুই সপ্তাহে সংঘাত আবারও বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ব্যাপক হামলাও ইরানকে তার সামরিক অবস্থান থেকে পিছু হটাতে পারেনি।"

ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ এবং জ্বালানি ও শরণার্থী সংকট তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করা এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার মতে, বর্তমান হামলাগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করছে এবং দেশটির নেতাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে বাইরের হুমকির দিকে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

শনিবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি লড়াই বন্ধ হয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ। ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো হামলা চালানোর পর গতকাল রাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি।

এর আগে শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, “দেখুন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান শুরু করতে পারি। তবে আমরা এখনো তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাই পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।”

চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগনের কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প বড় ধরনের হামলার কথা ভাবছিলেন। সেই লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও অস্ত্র পাঠানো হয় এবং ইরানের বেশ কিছু রেলসেতুতে হামলা চালানো হয়। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি বড় ধরনের একটি হামলার কথা বিবেচনা করছি। এটি আগের যেকোনো হামলার চেয়ে বড় হবে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি আছি। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।”

তবে সামরিক উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তার পর শুক্রবার রাতে তিনি এই পরিকল্পনা স্থগিত করেন। উপদেষ্টারা জানান, জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমছে। এপ্রিলের শেষ দিকে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যার প্রতিটির দাম ৪০ লাখ ডলারের বেশি।

ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ অনেক উপদেষ্টা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক আলোচনার পথটি কম ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, নৌ-অবরোধের ফলাফল মিশ্র বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মঙ্গলবার জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে, ফলে ইরানের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।