ইসলামের প্রথম শতাব্দী ছিল ইতিহাসের এক বিস্ময়কর সময়। মদিনার অলিগলিতে তখনো প্রতিধ্বনিত হতো ওহির যুগের স্মৃতি, আর বসরার মসজিদগুলোতে জন্ম নিচ্ছিল জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত। সেই সময়েই আবির্ভূত হন তাবেয়ি যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষী হাসান বসরি (রহ.), যাঁর তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখ জীবন মানুষকে আকৃষ্ট করত।
তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী। তাঁর পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় এসেছিলেন। "পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা—দুজনই ছিলেন ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় আসা মানুষ। যুদ্ধবন্দীদের মতো তাঁদেরও বিভিন্ন সাহাবির মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়।"
পিতা ইয়াসার বিশিষ্ট সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতের ঘরে এবং মাতা খাইরা নবীজির স্ত্রী উম্মে সালামার সান্নিধ্যে আশ্রয় পান (আল–হাসান আল–বাসরি হায়াতুহু ওয়া সিলাতুহু বিল হুক্কাম: পৃ. ১)। ২১ হিজরিতে খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মদিনায় হাসান বসরির জন্ম হয়। শৈশবে তিনি উম্মে সালামার (রা.) বিশেষ স্নেহ ও সান্নিধ্য লাভ করেন। একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, শিশু হাসান কাঁদলে উম্মে সালামা (রা.) তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন এবং স্তন্য দিয়ে ভোলাতেন। মুসলিম ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়, এই বরকতময় সান্নিধ্যই তাঁর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল (আত–তারিখুল কাবির: ২/২৮৯)।
ছোটবেলায় তিনি খলিফা ওমরের দোয়া লাভ করেন— ‘হে আল্লাহ, তাকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং মানুষের কাছে তাকে প্রিয় করে দিন।’ (আল–বিদায়া ওয়ান–নিহায়া: ৯/২৭৮)। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কোরআন হিফজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি তিনি হাদিস, লেখালিখি ও হিসাববিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। খলিফা ওসমানের খুতবা শোনার সৌভাগ্যও হয়েছিল তাঁর।
সিফফিনের যুদ্ধের পর হাসান বসরির পরিবার বসরায় স্থায়ীভাবে চলে আসে। সেখানে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, ইমরান ইবনে হোসাইন ও মুগিরা ইবনে শু’বা (রা.)-সহ অনেক সাহাবির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৪/৫৬৫)।
পরবর্তীতে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন এক অনন্য শিক্ষক। "একসময় তিনি নিজেও হয়ে ওঠেন অসাধারণ শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রমী। প্রতিদিন দুটি ‘দরস’ বসত। একটি ছিল মসজিদে, যেখানে সাধারণ মানুষ অবাধে প্রশ্ন করতে পারত।"
মসজিদের দরসে তিনি ছাত্রদের উত্তর দিতে উৎসাহিত করে নতুন আলেম তৈরি করতেন (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৪/ ৫৬৬)। অন্যদিকে তাঁর গৃহের দরসে কেবল আল্লাহভীরু মানুষরা উপস্থিত হতেন, যেখানে আলোচনা হতো আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া নিয়ে।
মসজিদের বাইরেও তিনি ছিলেন সাহসী ও দায়িত্বশীল। কাবুল অভিযান এবং খোরাসানের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সময়ে বসরার বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে মর্যাদাপূর্ণ এই পদে থেকেও তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করতেন না (তবাকাতে ইবনে সা’দ: ৭/১২৯)।
তাঁর ইবাদত ও আত্মসংযম ছিল অতুলনীয়। নিয়মিত রোজা ও তাহাজ্জুদের পাশাপাশি তিনি মানুষকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন (হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩৪)। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা এতটাই ছিল যে, সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) একবার বলেছিলেন, "হাসানের কাছে জিজ্ঞেস করো।" উপস্থিত লোকেরা বিস্মিত হয়ে বলল, "আমরা তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি!" তিনি উত্তর দিলেন, "আমরাও শুনেছি, সে–ও শুনেছে। তবে তার মনে আছে, আর আমরা ভুলে গেছি।" (হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩৪)।
কাতাদা (রহ.) তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘পূর্ণ মানবিকতার দিক থেকে হাসান বসরির মতো মানুষ আর কাউকে দেখিনি।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৪/৫৭৭)। মালেক ইবনে দিনার ও সাবেত বুনানির মতো মনীষীরা তাঁর ছাত্র ছিলেন (তারিখুল ইসলাম লিজ–জাহাবি: ৩/৯৯)।
১১০ হিজরির রজব মাসের এক শুক্রবার রাতে ৮৯ বছর বয়সে এই মহান তাবেয়ি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে বসরার কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়মিত আসরের জামাত সম্ভব হয়নি, যা বাইরে আদায় করতে হয়েছিল (তবাকাতে ইবনে সা’দ: ৭/১৩২)। যুদ্ধবন্দীর সন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়া হাসান বসরি (রহ.) শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন একটি জাতির বিবেক ও যুগের শিক্ষক।