বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশই শিশু। প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের মৃত্যু ঘটে এই কারণে। বিশেষ করে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে এবং তাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পানিতে ডুবে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জোয়ার রোধ করা যায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ড্যাডো) এই সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণালব্ধ তথ্য উপস্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং ড্যাডোর প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ ইদ্রিস আলম। তিনি বলেন, "বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে। যথাযথ তত্ত্বাবধান, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এসব মৃত্যু অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।"

অধ্যাপক ইদ্রিস আলম আরও উল্লেখ করেন যে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনা সাধারণত সকাল আটটা থেকে বেলা একটার মধ্যে ঘটে, যখন অভিভাবকরা কর্মব্যস্ত থাকেন। তবে তিনি মনে করেন, "শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর দায় কেবল একজন মা বা পরিবারের কোনো এক সদস্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবারের প্রত্যেক সদস্য, প্রতিবেশী, স্থানীয় সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্র—সবার।"

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, "পরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিরাপদ অবকাঠামো শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, নিরাপদ জনপরিসর এবং শিশুবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।"

পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী বলেন, "শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং তরুণদের স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।"

অন্যদিকে, আনসার ও ভিডিপির পরিচালক আমিনুল ইসলাম শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ড্যাডোর সভাপতি ব্যারিস্টার আফরোজা আক্তার। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, লাইফ সেভিং সোসাইটি চট্টগ্রাম নামের আরেকটি সংগঠন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক শোভাযাত্রার আয়োজন করে। সেখানে বক্তারা শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তারা পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

লাইফ সেভিং সোসাইটির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (অব.) ইফতেখার উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ বি এম জাইনূর রশিদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. জাহেদুল ইসলাম, সরকারি স্যার আশুতোষ কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জাহাঙ্গীর কবির, নৌ প্রকৌশলী সাজিদ হোসেন এবং লাইফ সেভিং সোসাইটি চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাবিবউল্লাহ বাহার। অনুষ্ঠানে পানিতে ডুবে স্বজন হারানো কয়েকজন অভিভাবক তাঁদের মানসিক কষ্টের কথা তুলে ধরেন এবং সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন।