নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) আয়োজিত বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনের প্যানেল আলোচনায় তিনি এই কথা বলেন। ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য: মানবাধিকার সুরক্ষায় টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ’ শীর্ষক ওই আলোচনায় তিনি অংশ নেন।

সারা হোসেন বলেন, "নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতে যেমন স্বাধীন তদন্ত হয় না, তেমনি বিচারকদের ক্ষেত্রেও হয় না। একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে। কিন্তু এটির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। অভিযোগ কী, কীভাবে তদন্ত হচ্ছে, তা জানা যায় না।"

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের রাখা কিছু বিধান বর্তমান সরকারের সময়ে বাদ যাওয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি কার্যকর কমিশন গঠনের সুযোগ থাকলেও তারা তা করেনি। তবে বর্তমান খসড়াটি নিয়ে তার মূল্যায়ন ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "তাদের করা খসড়ার চেয়ে বর্তমান খসড়াটি দুর্বল হওয়া মানেই পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে তা নয়। তবে এটা ২০০৯ সালের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।"

অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালী দয়ারত্নে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, "দুদক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হলে তাদের কাঠামোগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়োগ, বাজেট, জনবল নিয়োগ এবং কার্যক্রম পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কেবল আইনি ক্ষমতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মেধাভিত্তিক নির্বাচন চালু হলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি জন-আস্থা বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি একটি শক্তিশালী ও ফাঁকফোকরহীন আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি বলেন, "আমাদের একটি শক্তিশালী আইন দরকার, যেখানে কোনো ফাঁকফোকর থাকবে না। বর্তমান দায়িত্ব হলো এটা নিশ্চিত করা যে যাঁরা সরকারের বাইরে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর যেন নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ভুক্তভোগীরা এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারেন।"

ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, "ক্ষতিপূরণ প্রদান করা আসলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার করার একটি দায়িত্ব এবং ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার।"

আলোচনায় গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের খসড়া আইনে নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থার বিস্তারিত দিকগুলো তুলে ধরেন। অন্যদিকে, আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য আখতার হোসেন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর কথা বলেন। তিনি জানান, সরকার, বিরোধী দল ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন নিয়োগকারী সংস্থা গঠনের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য এফেয়ার্স দিপেক এলমার বলেন, একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণ—সবার স্বার্থেই কাজ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান পুরো প্যানেল আলোচনাটি পরিচালনা করেন।