ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি-পলাশী সংযোগ সড়কের র্যাম্প নির্মাণের ফলে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নগর-পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবাদীরা। একই সঙ্গে কাঁঠালবাগান, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, পলাশী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট এলাকার পরিবেশ ও যান চলাচলেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়। আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন, ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল চেঞ্জ, বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন, বিআইপি ও দুনিয়াদারি আর্কাইভ যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে।
আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন, কেবল মানুষের সুবিধার কথা ভেবে করা উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন নয়, কারণ প্রকৃতি ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাই উন্নয়নের প্রভাবে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্মের দুই সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব ও নাঈম উল হাসান। তাঁরা বলেন, "আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পান্থকুঞ্জ পার্কের আশপাশে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করার কথা নয়। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই আইনের তোয়াক্কা করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও এই কাজ বন্ধ করেনি। এখন বিএনপি সরকারও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এক প্রকল্পের জন্য পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিল এলাকার যত গাছ কাটা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে ঢাকায় আর মানুষ বসবাস করতে পারবে না।"
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পান্থকুঞ্জ পার্ক অংশের র্যাম্প বাতিলের দাবি জানান। তিনি বলেন, "এই র্যাম্প নির্মাণ হলে পান্থকুঞ্জ পার্ক, হাতিরঝিল জলাধার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও যান চলাচল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর সুবিধা মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরাই পাবেন।"
র্যাম্প বাতিলের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মুখে সরকারের কার্যকর সাড়ার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "জনগণের কথা শুনে র্যাম্পটি বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে আগের সরকারের সময়ে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, সেটিরও তদন্ত করতে হবে।"
কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা সাদমান সাকিব জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে আশ্রয়ের কোনো খোলা জায়গা বা খেলার মাঠ নেই। একমাত্র ভরসা ‘পান্থকুঞ্জ পার্ক’, যা এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও অপরিকল্পিত প্রকল্পের কারণে বেদখল হতে বসেছে। সাধারণ মানুষের কথা ভেবে এই কর্মযজ্ঞ নিয়ে পুনরায় ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ মন্তব্য করেন, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার অভাবে ঢাকা শহর ভয়াবহ জনদুর্ভোগের দিকে যাচ্ছে। পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হলেও কোনো সমাধান মেলেনি। ঢাকার পার্ক ও জলাভূমি রক্ষার জন্য ‘পার্ক অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অথরিটি’ নামে একটি আলাদা সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
বিআইপির সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, "যেই রাজউক বা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শুরুতে গেছে, সেই রাজউক বা সিটি করপোরেশনকে একই অবস্থায় রেখে বিএনপি সরকার পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেই প্রশ্ন আমাদের এখন তোলার সময় এসেছে।"
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন বুয়েটের তড়িৎ ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান, লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রদর্শনী বেঙ্গল স্ট্রিমের প্রধান কিউরেটর নিক্লাওস গ্রেবার এবং নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আবদুল্লাহ প্রমুখ।