যুক্তরাষ্ট্রে গত ৩৫ বছরের মধ্যে হামের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছে। টিকার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনীহার ফলে দেশটিতে এই সংক্রামক রোগের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) গত শুক্রবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩১৮টি সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি ২০২৫ সালের মোট সংক্রমণের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে রেকর্ড ২ হাজার ২৮৯টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল এবং দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু ঘটেছিল।
এই পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সভাপতি অ্যান্ড্রু রেসিন বলেন, ‘আমরা এমন একটি সংকটের মুখোমুখি হয়েছি, যা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব ছিল। অথচ এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশুরা।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘এটিকে কোনোভাবেই আমাদের নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।’
চিকিৎসকদের মতে, হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি। তবে এটি নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা এমনকি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় রোগটি পুনরায় ফিরে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রাদুর্ভাবটি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্ট ও অলাভজনক সংস্থা কেএফএফ-এর একটি যৌথ জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ছয় মার্কিন অভিভাবকের একজন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ও জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থার অভাবের কারণে সন্তানদের টিকা দিতে চান না বা দেরি করেন। বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ ও রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।
সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেলিসা নোলান বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অনেক হামের সংক্রমণ শনাক্তই হচ্ছে না।’ চলতি বছর সাউথ ক্যারোলাইনাতে সর্বোচ্চ সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তিনি এএফপি-কে জানান, ‘যেসব মানুষ সন্তানদের টিকা দেন না, সাধারণত চিকিৎসা নিয়েও তাঁদের মধ্যে অনীহা বা দ্বিধা থাকে।’
যুক্তরাষ্ট্রে টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও অনেক অঙ্গরাজ্যে ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অধ্যাপক নোলান জানান, কোভিড-১৯ মহামারির পর টিকা না নেওয়ার প্রবণতা এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার বেড়েছে। সাউথ ক্যারোলাইনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে এমন অসংখ্য জায়গা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক গ্রুপ ও পেজ আছে, যেখানে মানুষকে শেখানো হয় কীভাবে টিকা না নেওয়ার জন্য আইনি ছাড় পাওয়া যায়।’
অধ্যাপক নোলানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আরও বড় সংকটের পূর্বাভাস। তাঁর আশঙ্কা, আগামী দিনে হুপিং কাশি এবং টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য অন্যান্য রোগের সংক্রমণও বৃদ্ধি পেতে পারে।