ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পৌর শহরের প্রধান বাসস্ট্যান্ড থেকে বড়বাজার পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখন ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী, ইজিবাইক, মোটরচালিত রিকশা, ভ্যান ও বিভিন্ন যানবাহনের দখলে। ফলে প্রতিদিন তীব্র যানজট, পথচারীদের ভোগান্তি, ব্যবসায়ীদের লোকসান এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কের দুই পাশের অধিকাংশ জায়গা দখল করে বসেছেন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা। ডাব, সেদ্ধ ডিম, মৌসুমি ফল, ফলের জুস ও পপকর্নসহ বিভিন্ন পণ্যের পশরা বসানো হয়েছে রঙিন ছাতা টাঙিয়ে। এর সঙ্গে ইজিবাইক, মোটরচালিত রিকশা ও ভ্যানের অবাধ অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সড়কের ডিভাইডারের উত্তর পাশে প্রায় ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তার অন্তত ২৫ ফুট এবং দক্ষিণ পাশে প্রায় ২৫ ফুট রাস্তার ২০ ফুটই অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচলের জন্য সামান্য জায়গা অবশিষ্ট থাকায় সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কের বেহাল দশা। দীর্ঘদিন ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় বর্ষার পানি জমে সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে জমে থাকা কাদা-পানির ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে যানবাহন চলাচল করলে পানি ছিটকে এসে পড়ে পথচারী, দোকানপাট ও ক্রেতাদের গায়ে। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে ভোগান্তি।

এদিকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে পৌরসভার উদ্যোগে শহরের প্রধান বাসস্ট্যান্ড থেকে মধুগঞ্জ বাজারের ডাচ-বাংলা ব্যাংক পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার ও আধুনিক সড়কবাতি স্থাপন করা হয়। উদ্বোধনের পর রাতে পুরো সড়ক আলোকিত থাকায় এলাকাটি দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ল্যাম্পপোস্টের বাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রাতের বেলায় সড়কটি আবারও অন্ধকারে ডুবে থাকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুত এগুলো মেরামতের দাবি জানিয়েছেন।

সড়কের পাশে অবস্থিত ‘রূপসাগর গ্লাস হাউস’-এর ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা লাখ লাখ টাকা অগ্রিম এবং প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করি। অথচ দোকানের সামনেই ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা সহজে দোকানে আসতে পারেন না। মোকাম থেকে মালামাল আনলেও দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করানোর জায়গা মেলে না। এ বিষয়ে কিছু বলতে গেলেই প্রতিনিয়ত বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। বহুবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো সমাধান পাইনি।

সড়কের দক্ষিণ পাশের ‘সিসকন ইলেকট্রিক’-এর স্বত্বাধিকারী রানা বলেন, দোকানের সামনে যানজট, অবৈধ পার্কিং এবং ফুটপাতের দোকানের কারণে ক্রেতারা ঢুকতেই পারেন না। প্রায় প্রতিদিনই এসব নিয়ে ঝামেলা হয়। বিভিন্ন অফিস, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বড়বাজারে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে দিনভর যানজট লেগে থাকে। বর্ষায় জমে থাকা কাদা-পানির ছিটা দোকান ও ক্রেতাদের গায়ে লাগে। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাও এই পথে চলাচল করেন, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

পথচারী ইমন হোসেন বলেন, এখন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে। কখন যে দ্রুতগতির কোনো গাড়ি কাদা-পানি ছিটিয়ে দেবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। বছরদুয়েক আগে দেখেছি এই শহরের প্রবেশমুখে বাঁশকল করা হয়েছিল, যাতে শহরের ভেতর বড় বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য ভারী যানবাহন ঢুকতে না পারে। সেটিও এখন আর নেই। ফলে হরহামেশাই বড় যানবাহন ঢুকে পড়ছে এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি করছে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত বিষয়টি দেখা উচিত।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী বলেন, পৌরসভার হাট-বাজারের ইজারাদারের লোকজন প্রতিদিন এবং হাটের দিনে আমাদের কাছ থেকে খাজনা নেন। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা নির্ধারিত হারে খাজনা দিয়ে এখানে ব্যবসা করছি। শুরুতে ব্যবসা করার সুযোগ পেতে এককালীন অগ্রিম টাকাও দিতে হয়েছে। এখানে লোকসমাগম বেশি হওয়ায় বিক্রি ভালো হয়। এই ব্যবসার ওপরই আমাদের পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে। তবে পৌরসভা যদি আমাদের জন্য উপযুক্ত কোনো বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা সেখানে চলে যেতে প্রস্তুত।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী কবির হাসান বলেন, মেইন বাসস্ট্যান্ড থেকে বড়বাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের নতুন বাজারসংলগ্ন মিনি স্টেডিয়াম এলাকায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সড়কে জটলা সৃষ্টি করা ইজিবাইক, রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের জন্যও নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে।

তিনি আরও জানান, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের বিষয়টি হাট-বাজারের ইজারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে যারা হাটবাজার ইজারা নিয়েছেন, তারাই নিয়ম অনুযায়ী খাজনা আদায় করে থাকেন।

সড়কের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সড়ক মেরামতের জন্য দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু হবে। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও ছোট যানবাহন স্থানান্তর এবং সড়ক সংস্কারের কাজ শেষ হলে যানজট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছি।

সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কালীগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে প্রধান বাসস্ট্যান্ড থেকে বড়বাজার ব্রিজ পর্যন্ত ফুটপাতে টাইলস বসানো হয়। পরে ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডিভাইডার ও আধুনিক সড়কবাতি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তবে বর্তমানে সড়কের অবৈধ দখল, যানজট, জলাবদ্ধতা ও অচল সড়কবাতির কারণে সেই কোটি টাকার উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পৌরবাসী।