গত বছর এই সময়ে পানির অভাবে পাট জাগ দিতে হিমশিম খেতে হয়েছিল জামালপুরের কৃষকদের, হতাশা ছিল বাজারদর নিয়েও। তবে এক বছরের ব্যবধানে সেই চিত্রে এসেছে বড় বদল। এবার মাঠে ভালো ফলন, খালে-বিলে পর্যাপ্ত পানি এবং হাটে কাঙ্ক্ষিত দাম—সব মিলিয়ে জামালপুরের ইসলামপুরে পাটচাষিদের ঘরে ফিরেছে স্বস্তি। নতুন পাট বিক্রি করে গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি পাচ্ছেন তারা। ফলে ‘সোনালি আঁশ’ ঘিরে আবার তৈরি হয়েছে নতুন আশা।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) উপজেলার গুঠাইলসহ বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা যায়, নতুন পাট মণপ্রতি ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে সমমানের পাট বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকায়। দামের এই বড় ব্যবধানে কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উৎসাহ।

ইসলামপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৭ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অনূকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ফলনও আশানুরূপ। গত বছর অনাবৃষ্টির কারণে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়লেও এবার পর্যাপ্ত পানি থাকায় কৃষকদের সেই সংকটে পড়তে হয়নি।

সাপধরী ইউনিয়নের কাঁসারিডোবা গ্রামের কৃষক সামিউল চৌধুরী বলেন, বছরের পর বছর পাট চাষ করে এমন দাম খুব কমই দেখেছি। এবার ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারে দামও মিলছে ভালো। তবে পাটচাষে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এতে আমরা অনেকেই উপকৃত হবো।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে পাটের দাম বাড়লেও বেড়েছে উৎপাদন খরচও। বিশেষ করে শ্রমিকের মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছর প্রতি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি যেখানে ছিল ৭০০ টাকা, এবার পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। ফলে প্রতি মণ পাট উৎপাদনে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি।

উপজেলার অন্যতম বড় পাটের বাজার গুঠাইল হাটে গত দুই সপ্তাহ ধরে নতুন পাটের কেনাবেচা চলছে। মৌসুমের শুরু হওয়ায় বাজারে সরবরাহ এখনও তুলনামূলক কম। মূলত আগাম চাষ করা কৃষকরাই হাটে পাট নিয়ে আসছেন।

গুঠাইল হাটের পাট ব্যবসায়ী হাসমত আলী বলেন, দিন যত যাবে, বাজারে পাটের সরবরাহ তত বাড়বে। তবে মৌসুমের শুরু হিসেবে এখনই ভালো পরিমাণ পাট আসছে। সপ্তাহখানেক আগে মণপ্রতি ৪ হাজার ৪০০ টাকায় পাট বিক্রি হলেও বর্তমানে দাম আরও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। কাঙ্ক্ষিত দাম পেয়ে কৃষকরাও সন্তুষ্ট।

তবে হাটে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন কৃষকরা।

গোয়ালেরচর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের মাইনুল মিয়া বলেন, এখন পাটের যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আমরা খুশি। কিন্তু সামনে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যাওয়ার ভয় থাকছে। আগেও এমনটা ঘটেছে। তাই এই দাম যেন পুরো মৌসুমজুড়ে বজায় থাকে, সেটাই আমরা চাই।

একই কথা বললেন লক্ষ্মীপুর গ্রামের সালাম মিয়াও। তিনি জানান, বর্তমান বাজারদরে পাট বিক্রি করে লাভ হচ্ছে। তবে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেলে সেই লাভের হার কমে যাবে। তাই বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে।

ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল আহমেদ বলেন, আবহাওয়া, ফলন ও বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় এবার পাটচাষিরা লাভজনক অবস্থায় রয়েছেন। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, কৃষক প্রতি মণে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি লাভ করছেন। তবে বাজারে পাটের পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ এখনো শুরু হয়নি। আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহ পর বাজার পূর্ণ জমে উঠলে প্রকৃত দরপরিস্থিতি বোঝা যাবে।

একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পাট। সেই সোনালি আঁশ আবারও ইসলামপুরের কৃষকদের ঘরে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এখন চাষিদের একটাই প্রত্যাশা—পুরো মৌসুমজুড়ে যেন এই বাজারদর স্থিতিশীল থাকে, যাতে তারা কষ্টের সঠিক সুফল ঘরে তুলতে পারেন।