মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও ইন্টারনেট ব্যবহার, স্মার্টফোনের বিস্তার এবং ডিজিটাল সেবার কার্যকর প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেশ এখনো পিছিয়ে আছে। গত এক দশকে আইসিটি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে। এখন সময় এসেছে সেই অবকাঠামোর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং উন্নত ডিজিটাল নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার। তবে ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে এই সুফল পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান শর্ত হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। সেই লক্ষ্যেই ১৩ বছর আগে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে এর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ছিল অসম্পূর্ণ। বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা বা পদার্থবিজ্ঞানের মতো অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি ক্লাস নিচ্ছেন। অথচ আইসিটি এমন একটি বিষয়, যার জ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এছাড়া পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাস্তবতার এক স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আইসিটি একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ব্যবহারিক বিষয় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পাঠ্যক্রমে এখনো মুখস্থনির্ভরতার প্রভাব বেশি এবং প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার মতো বিষয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সীমিত।

পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা এবং ল্যাব সুবিধার মতো বাস্তব বিষয়গুলো যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি বলে মনে হয়। এর ফলে কলেজ পর্যায়ে যেসব মৌলিক বিষয় আয়ত্ত করার কথা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেগুলো নতুন করে শিখতে বাধ্য হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, আইসিটি শিক্ষাকে শুধু বোর্ডে লিখে শেখানো যায় না; এটি মূলত ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের বিষয়। কেবল কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন বা ইন্টারনেট সংযোগ দিলেই উদ্দেশ্য পূরণ হয় না, বরং সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করে না, অথচ সরকারি সেবার একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে অনলাইননির্ভর হয়ে পড়ছে। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সুফল জনগণের একটি বড় অংশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন বা অন্যান্য ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ স্মার্টফোন এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। তবে মোবাইল ডেটার মূল্য, সেবার মান এবং অপারেটরদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ এখনো বিদ্যমান।

অন্যদিকে, ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং ডিপফেকের বিস্তার বাড়ছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষায়িত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের ঘটনা নিয়মিত সামনে আসছে, যা উদ্বেগের বিষয়।

এই সমস্যাগুলোর কোনো একক সমাধান নেই। শিক্ষক নিয়োগ ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে কলেজ পর্যায়ে ল্যাবভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সবচেয়ে জরুরি। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, আধুনিক শিক্ষণ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে ডিজিটাল উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।

—অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন, পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়