সকাল সাড়ে আটটা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে সাইরেন বাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। রোগীর স্বজনেরা উৎকণ্ঠিত। সামনে দীর্ঘ সড়কজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। স্টেশন রোড থেকে গাঙ্গিনারপাড়, সেখান থেকে পাটগুদাম ব্রিজ—সবখানেই একই চিত্র। রেলগেট বন্ধ, সড়কের একাংশে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সারি, ফুটপাতে দোকান—আর তার মাঝখানে আটকে আছে শত শত মানুষ। যানজটের এই দৃশ্য কোনো এক দিনের নয়, প্রতিদিনের। সকাল থেকে রাত—যেন যানজটই ময়মনসিংহ নগরীর প্রধান পরিচয়।

২০১৫ সালে বিভাগ ঘোষণার পর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে ময়মনসিংহ। কিন্তু নগরীর সড়কব্যবস্থা সেই গতিতে এগোয়নি। ফলে আজ বিভাগীয় শহরের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যানজট।

২০১৮ সালে সিটি করপোরেশন গঠনের পর নগরীর আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও সড়কের অবকাঠামো প্রায় আগের অবস্থাতেই রয়েছে।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে প্রায় ছয় হাজার। পাশাপাশি সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মিশুক এবং প্রায় পাঁচ হাজার ৪০০ চিকন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন অর্ধেক অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে এর দ্বিগুণ যানবাহন সড়কে নামে। এর বাইরে অনুমোদনহীন বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত যান প্রতিদিন নগরীতে চলাচল করছে। ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি চাপ পড়ছে পুরোনো সড়কগুলোর ওপর।

ময়মনসিংহ শহরের অন্যতম বড় সংকট রেলক্রসিং। শহরের ভেতরের অংশেই রয়েছে ১০টি রেলক্রসিং। সকাল সাতটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মোট ২৪টি ট্রেন চলাচল করে। প্রতিটি ট্রেন অতিক্রমের সময় রেলগেট বন্ধ থাকায় দিনে মোট ৪৮ বার যান চলাচল থমকে যায়। প্রতিবারে প্রায় ১০ মিনিট করে যানবাহন আটকে থাকে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র কয়েক মিনিটের এই বিরতিই কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করে, যা স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগে যায়।

শুধু ময়মনসিংহের নয়, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যানবাহনও ব্রহ্মপুত্র সেতু হয়ে এই মোড় ব্যবহার করে। তবে একই স্থানে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, সিএনজি স্ট্যান্ড এবং স্থানীয় যানবাহনের ভিড় থাকায় পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এখন নগরীর সবচেয়ে বড় ‘বটলনেক’ বা প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে। সড়কের একটি বড় অংশজুড়ে সিএনজি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় কার্যত যান চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

শহরের অধিকাংশ ফুটপাত পথচারীদের ব্যবহারের উপযোগী নয়। কোথাও দোকান, কোথাও হকার, আবার কোথাও মোটরসাইকেল পার্কিং। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীরা সড়কেই হাঁটছেন, যা যানবাহনের গতি আরও কমিয়ে দিচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, স্টেশন রোড, গাঙ্গিনারপাড়, সি কে ঘোষ রোড, চরপাড়া, পাটগুদাম ব্রিজ ও ব্রিজ মোড়, নতুন বাজার, জিলা স্কুল মোড়, সানকিপাড়া এবং কেওয়াটখালী বাইপাস এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় তীব্র যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে অফিস শুরু ও ছুটির সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও বন্ধের সময় এবং ট্রেন চলাচলের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ বিশ্বের ১৫২টি দেশের এক হাজার ২০০টি শহরের যান চলাচলের গতি বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। তাতে সবচেয়ে ধীরগতির শহর হিসেবে ঢাকার পর নবম অবস্থানে উঠে আসে ময়মনসিংহের নাম। এই তথ্যই প্রমাণ করে, যানজট এখন আর শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের উদ্বেগের বিষয়।

নগরীর ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষক সারোয়ার হোসেন বলেন, সকালের অফিসগামী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীর উৎকণ্ঠা, হাসপাতালমুখী রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের অসহায় অপেক্ষা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এখন ময়মনসিংহ শহরের যানজট। বিভাগীয় শহরের মর্যাদা পাওয়ার এক দশক পরও নগরবাসীর সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই। জনপ্রতিনিধি বদলেছে, প্রশাসনের নেতৃত্ব বদলেছে, নানা পরিকল্পনার ঘোষণাও এসেছে; কিন্তু আজও আমাদের প্রশ্ন একটাই—ময়মনসিংহের যানজটের সমাধান কবে?

চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত টুটুল বলেন, ময়মনসিংহ এখন শুধু একটি জেলা শহর নয়, এটি দেশের অষ্টম বিভাগীয় নগরী। কিন্তু বিভাগীয় শহরের মর্যাদার সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার মিল নেই। যানজট এখন কেবল মানুষের সময় নষ্ট করছে না, এটি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করছে, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানকে প্রতিদিন আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘নাগরিক সমাজ’-এর সদস্যসচিব সামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, প্রতিদিন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। এতে সময়, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় হচ্ছে। প্রশাসনের সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, শহরের ভেতরের রেলক্রসিংগুলো সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে যানজট অনেকাংশেই কমে আসবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ময়মনসিংহের যানজট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি পদক্ষেপ প্রয়োজন: শহরের ভেতরের রেলক্রসিংগুলোর বিকল্প ব্যবস্থা করা বা ওভারপাস নির্মাণ, পাটগুদাম এলাকা থেকে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ও সিএনজি স্ট্যান্ড স্থানান্তর, অবৈধ ও অতিরিক্ত ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব নগর গড়ে তোলা এবং বিকল্প সড়ক নির্মাণসহ পুরোনো সড়ক সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।

ময়মনসিংহ ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) আবু নাসের মোহাম্মদ জহির বলেন, গত চার দশকে শহরের একটি সড়কও প্রশস্ত হয়নি, অথচ যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। শুধু ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, রাস্তা সম্প্রসারণ, অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং রেলক্রসিং স্থানান্তর ছাড়া স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ বলেন, পুরোনো শহরের সড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তবে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরীফুল আলম জানান, তিন হাজার ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন কেওয়াটখালী আর্চ স্টিল সেতুর কাজ শেষ হলে পাটগুদাম ব্রিজের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে নগরীর অন্যতম প্রধান যানজটপ্রবণ এলাকা পাটগুদাম মোড় অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, আমরা যানজট সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। তবে এটি এক দিনে সমাধানযোগ্য নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করা হবে।