জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার অনুযায়ী নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছেন দেশের ৬৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা এবং গণরায়ের প্রতি অনীহা দেখা দিলে রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের সম্ভাবনা বিপন্ন হতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার পরিবর্তে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দ্বিধার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা ছিল। সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একইভাবে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা। এই পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
জুলাই আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার শেষ সময় ছিল ১৫ মার্চ। রাষ্ট্রপতির এই অধিবেশন আহ্বান করার কথা থাকলেও তা হয়নি।
আজকের বিবৃতিতে বলা হয়, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক আহ্বান।"
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা জানান, জনগণের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান তাঁদের উদ্বিগ্ন করেছে। সংসদীয় প্রক্রিয়ার গুরুত্ব স্বীকার করেও তাঁরা মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থানের বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশার আলোকে সাংবিধানিক রূপান্তরের কার্যকর পথ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতা শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না; জনগণের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষা, গণ-আন্দোলনের শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতিও এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গণরায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করলে রাজনৈতিক আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সুযোগ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন স্বাক্ষরকারীরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিবৃতিতে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। দাবিগুলো হলো— জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে একটি স্বাধীন, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন; গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
পাশাপাশি দেশের জনগণ, বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিক ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা, গণরায়ের প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল বাশার, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুরসহ শিক্ষক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।