একটি দেওয়ালে পেরেক ঠোকার পর কখনো আবার তুলে ফেললেও যেমন সেখানে স্পষ্ট চিহ্ন থেকে যায়, তেমনি মানুষের ভালো কিংবা মন্দ কাজের প্রভাবও জীবনের ক্যানভাসে গভীর দাগ রেখে যায়।
ভুল স্বীকার করে মাফ চেয়ে পাপের সাময়িক জবাবদিহি এড়ানো যায় বটে, কিন্তু পেছনে ফেলে আসা ক্ষত মোছা সহজ নয়। প্রয়োজন হয় দীর্ঘ দিনের সংস্কার ও আত্মশুদ্ধির। ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষের কর্ম এবং তার এই সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
.পবিত্র কোরআনে কাজের প্রভাব বা অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণের কথা স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। প্রতিটি কাজের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাওতুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তারা যা আগে পাঠিয়েছে তা ও তাদের রেখে যাওয়া চিহ্নসমূহ লিখে রাখি; আর প্রতিটি বস্তু আমি এক স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষণ করে রেখেছি।” (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২)
এ আয়াতের ‘আছার’ (রেখে যাওয়া চিহ্ন) শব্দের ব্যাখ্যা করে আল্লামা ইবনে আশুর লিখেছেন, “এখানে ‘আছার’ বলতে কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ফলাফলকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের মূল কাজের চেয়ে ভিন্ন বিষয়। কারণ আয়াতে কাজের পাশাপাশি আলাদাভাবে এর চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।” (ইবনে আশুর, তফসির আত-তাহরির ওয়াত-তানবির, ২৩/৩৪৫, দার সাহনুন, তিউনিস: ১৯৮৪)
.নিশ্চয়ই আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তারা যা আগে পাঠিয়েছে তা ও তাদের রেখে যাওয়া চিহ্নসমূহ লিখে রাখিসুরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২
মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব শুধু যে তার ব্যক্তিগত আমলনামা বা সমাজকে প্রভাবিত করে তা নয়; বরং তা বিশ্বপ্রকৃতির ওপরও গভীর ছাপ ফেলে। মানুষ যখন অবিচার ও অন্যায়ে লিপ্ত হয়, তখন তার কুফল জলে-স্থলে ছড়িয়ে পড়ে।
কোরআনে এর স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, “মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে তিনি তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)
অর্থাৎ, বিশ্বচরাচরে মানুষের পাপাচারের কারণে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তা মূলত তাদেরই কৃতকর্মের পরিণতি।
অন্যদিকে, আল্লাহর রহমতের নিদর্শন নিয়েও মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানুষের মনে ইতিবাচকতা ও আশাবাদের সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন, “অতএব আল্লাহর রহমতের চিহ্নের দিকে তাকাও, কীভাবে তিনি জমিনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন; নিশ্চয়ই তিনি মৃতকে জীবিতকারী এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সুরা রুম, আয়াত: ৫০)
.‘আমি তোমাদের জন্য আশঙ্কা করছি’.আমাদের সমাজে প্রায়শই একটি বৈপরীত্য দেখা যায়। অনেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছেন, অথচ তাদের সামাজিক লেনদেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ কিংবা নীতি-নৈতিকতায় চরম ত্রুটি বিদ্যমান। তাহলে নামাজ কি তার জীবনে প্রভাব রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে?
প্রকৃতপক্ষে, নামাজের প্রভাব নির্ভর করে তা আদায়ে তার আন্তরিক উপস্থিতির ওপর। যদি কেউ কেবল আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য নামাজে দাঁড়ায়, তবে তার অন্তরে নামাজের সত্যিকারের প্রভাব তৈরি হয় না।
এ পার্থক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, “একজন মানুষ নামাজ আদায় করে বিদায় নেয়, অথচ তার জন্য তার নামাজের দশভাগের একভাগ, নয়ভাগের একভাগ, আটভাগের একভাগ, সাতভাগের একভাগ, ছয়ভাগের একভাগ, পাঁচভাগের একভাগ, চারভাগের একভাগ, তিনভাগের একভাগ বা অর্ধেক ছাড়া আর কিছুই লেখা হয় না।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৭৯৬)
.যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের জুলুমের কারণে তখনই পাকড়াও করতেন, তবে কোনো জীবজন্তুকে ভূমণ্ডলে ছাড়তেন না; কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন।সুরা নাহল, আয়াত: ৬১
অথচ যদি সঠিক মনোযোগের সঙ্গে নামাজ আদায় করা হয়, তবে তা মানুষকে পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
নফল বা অন্যান্য ভালো কাজের মাধ্যমেও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব, যদি তাতে নিষ্ঠা থাকে। রাসুলের কাছে একবার বলা হলো যে এক ব্যক্তি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে কিন্তু সকালে চুরি করে। তিনি উত্তরে বললেন, “খুব শীঘ্রই তার এই নামাজ তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখবে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯৭৭৭)
অর্থাৎ, নিয়মিত নামাজ ও ইবাদতের একটি অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে যা মানুষকে ধীরে ধীরে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে।
.জীবনের মেয়াদ সীমিত, কিন্তু ভালো বা মন্দ কাজের প্রভাব হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী। মৃত্যুর পরও কীভাবে মানুষ কাজের মাধ্যমে সওয়াব বা পাপের অংশীদার হতে পারে, তা ইসলামের এক অনন্য দর্শন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া বাকি সব কাজের পথ বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া (প্রবহমান দান), এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, অথবা সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
.‘আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, আমিই সংরক্ষক’.অন্যায় বা পাপ করার সঙ্গে সঙ্গেই যদি এর শাস্তি দৃশ্যমান হতো, তবে পৃথিবী মানবশূন্য হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাঁর অসীম রহমতে মানুষকে তওবা করার ও শুধরে যাওয়ার সুযোগ দেন।
কোরআনে বলা হয়েছে, “যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের জুলুমের কারণে তখনই পাকড়াও করতেন, তবে কোনো জীবজন্তুকে ভূমণ্ডলে ছাড়তেন না; কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৬১)
একইভাবে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শোনা জুমার খুতবা, ধর্মীয় আলোচনা বা উপদেশগুলোর প্রভাব কতটুকু আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করছে—সে বিষয়ে ভাবা প্রয়োজন।
উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে অন্তরের ব্যাধি দূর হয়, কারণ আল্লাহ ওহির বিধান সম্পর্কে বলেছেন, “হে মানবজাতি, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরের ব্যাধির আরোগ্য, আর মুমিনদের জন্য হেদায়েত ও রহমত।” (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫৭)
.আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যেসব কা করি বা শব্দ উচ্চারণ করি, তার একটি স্থায়ী ছাপ থেকে যায়। আখেরাতে আমলের পাশাপাশি তার প্রভাবও দেখতে পাওয়া যাবে।.
অনেক সময় আমরা মনে করি আমাদের ক্ষুদ্র চেষ্টা বা সামান্য একটি কথা হয়তো কোনো পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু আল্লাহর দরবারে নিষ্ঠাপূর্ণ কোনো কাজের প্রতিদান কখনো হারিয়ে যায় না।
আল্লাহ–তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না।” (সুরা কাহফ, আয়াত: ৩০)
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় পরিবর্তনের পেছনে ছিল একটি ছোট কথা। ইমাম বুখারি (রহ.) যখন হাদিস সংকলনের দায়িত্ব হাতে নেন, তার পেছনে মূল অনুঘটক ছিল তাঁর ওস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ-এর একটি সাধারণ মন্তব্য।
ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন, “আমরা যখন ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহের মজলিসে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি রাসুলের সহিহ হাদিসগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ সংকলন করতে পারতে!’ এ কথাটি আমার মনে গভীর রেখাপাত করল এবং আমি এই গ্রন্থ সংকলনে হাত দিলাম।” (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহ সহিহ আল-বুখারি, ১/৭, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)
একজন শিক্ষকের একটি সাধারণ পরামর্শ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বিশুদ্ধতম গ্রন্থ উপহার দিয়েছে। এটিই হলো কথা ও কাজের অবিনাশী প্রভাব।
একইভাবে আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যেসব কা করি বা শব্দ উচ্চারণ করি, তার একটি স্থায়ী ছাপ থেকে যায়। আখেরাতে আমলের পাশাপাশি তার প্রভাবও দেখতে পাওয়া যাবে।
মুমিন হিসেবে তাই প্রতিটি পদক্ষেপের আগে চিন্তা করা উচিত—এই কাজের প্রভাব কি কল্যাণ বয়ে আনবে, নাকি পেরেক তোলার পরও দেওয়ালে থেকে যাওয়া ক্ষতচিহ্নের মতো এক স্থায়ী ধ্বংসের সূচনা করবে।
.পরকালে শয়তানের দায়মুক্তি আর অনুসারীদের আক্ষেপ