১৯ জুলাই রাত সাড়ে নয়টা। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বাসিন্দা আমজাদ আলীর মুঠোফোনে অচেনা একটি নম্বর থেকে কল আসে। ওই প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘ডিবি থেকে বলছি। আপনার ছেলেকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে।’

এরপর কান্নার শব্দ শোনানো হয় মুঠোফোনে। আর বলা হয়, কণ্ঠটি তাঁর ছেলের। কথিত ডিবির (গোয়েন্দা পুলিশ) কাছ থেকে ছেলেকে ছাড়াতে বিকাশ নম্বরে দ্রুত টাকা পাঠাতে বলা হয়।

আমজাদ আলীর ছেলে শাকিল হোসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী (৪৮তম ব্যাচ)। অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়ে ছেলেকে দ্রুত ছাড়িয়ে নিতে বাবা বাড়ি থেকে বাজারের উদ্দেশে বের হন বিকাশে টাকা পাঠাতে। এর মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যরা যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন শাকিল নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলেই আছেন।

.

শাকিলের বাবার মতো একই ঘটনা ঘটে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী (৫৫তম ব্যাচ) তাসনিম আলমের বাবার সঙ্গে। তাসনিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতারকেরা তাঁর পরিচয় এতটাই নিখুঁতভাবে বলেছিল যে বাবা প্রথমে ঘাবড়ে যান। তবে স্কুলশিক্ষক বাবার সচেতনতায় শেষ পর্যন্ত টাকা খোয়াতে হয়নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুটি ফেসবুক গ্রুপে গত ছয় মাসে অন্তত ৬৬ শিক্ষার্থী এমন অভিযোগ করেছেন। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবারও এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, তাঁর পরিবারের সঙ্গেও প্রতারণার এমন ঘটনা ঘটেছে।

শিক্ষার্থীরা বলেছেন, কখনো ডিবি বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে আবার কখনো বৃত্তির টাকা পাঠাতে জটিলতার কথা বলে প্রতারণা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, ফাঁদে ফেলে টাকা নেওয়া।

.
যেসব নম্বর থেকে প্রতারণা করা হচ্ছে, সে নম্বরগুলো শিক্ষা শাখায় দিলে আমরা আইনি সহায়তা দেব।
মোহাম্মদ কামরুল আহসান, উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
.

ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা বলেছেন, প্রতারকেরা যেসব তথ্য ফোনে বলেছে, সেগুলো ভর্তির সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়। তাঁদের প্রায় সবার অভিজ্ঞতা একই রকমের।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হয়ে শিক্ষা শাখাকে জানিয়েছিলাম। তারা একটা অবজারভেশনও (পর্যবেক্ষণ) দিয়েছে ইতিমধ্যে। রেজিস্ট্রারকে বলেছি একটি সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিতে, যাতে শিক্ষার্থীরা এমন প্রতারণা থেকে সাবধান হতে পারে। এ ছাড়া যেসব নম্বর থেকে প্রতারণা করা হচ্ছে, সে নম্বরগুলো শিক্ষা শাখায় দিলে আমরা আইনি সহায়তা দেব।’

.

শুধু ভয় দেখিয়ে নয়, প্রতরাণা করে সরাসরি ব্যাংক হিসাব থেকেও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। উপবৃত্তি বা মেধাবৃত্তির টাকা দিতে গিয়ে অ্যাকাউন্টে জটিলতা হয়েছে—এমন অজুহাতে চাওয়া হচ্ছে ব্যাংক হিসাব নম্বর ও ওটিপি (গোপন পাসওয়ার্ড)।

এমন ফাঁদে পড়ে দুই দফায় ৩৬ হাজার টাকা খুইয়েছে চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী (৪৮তম ব্যাচ) আকিবা মোস্তফার পরিবার। আকিবা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মায়ের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ওই ব্যক্তি (প্রতারক) নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার উপবৃত্তির টাকা ব্যাংক হিসাবে ঢুকছে না, তাই অন্য একটি হিসাব নম্বর দিতে হবে। মা–বাবা বিষয়টি না বুঝে তথ্য দিলে তারা অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেয়।’

.

১০ হাজার টাকা খুইয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী (৫৪তম ব্যাচ) সাজিয়া আফরিনের পরিবার। সাজিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একজন ফোন দিয়ে নিজেকে জাবি থেকে বলছে দাবি করে আমার নাম, বিভাগ, বর্ষ—সব সঠিকভাবে বলে। এতেই বাবা বিশ্বাস করেন। পরে বলে, মেধাবৃত্তির টাকায় জটিলতা হয়েছে, সমাধানে ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও ওটিপি লাগবে। ওটিপি দেওয়ার পরই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চলে যায়।’

জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া আফনানের অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া তাঁর নথিপত্রে দেওয়া ছিল বড় বোনের মুঠোফোন নম্বর। সেই নম্বরে প্রথমে কল আসে। পরে তিনি নিজেই সেই নম্বরে ফোন দিলে বলা হয় ‘রেজিস্ট্রার ভবনের ২০৮ নম্বর কক্ষ থেকে বলছি, সরকার পতনের জেরে উপবৃত্তির টাকা দিতে জটিলতা হচ্ছে, এটিএম কার্ডের ছবি লাগবে।’ পরে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেন, রেজিস্ট্রার ভবনে ২০৮ নম্বর নামে কোনো কক্ষই নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে, তা সংগ্রহ করে পুলিশের মাধ্যমে চক্রটি শনাক্ত করা যায় কি না, রেজিস্ট্রারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

.

ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রতারকদের ব্যবহৃত তথ্যগুলো তাঁরা ভর্তির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শাখায় জমা দিয়েছিলেন। উপবৃত্তি-সংক্রান্ত তথ্য থাকে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখায়। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব শাখা থেকেই তথ্য ফাঁস হচ্ছে।

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দুটি দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকে এমন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। কারা বৃত্তি পেয়েছে, সে তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, সেখানে ফোন নম্বর থাকে না। আমাকেও কয়েক দিন আগে এই চক্র ফোন দিয়েছে। সচেতনতা ছাড়া উপায় নেই, চক্রটি সবাইকে কল দিচ্ছে।’