স্বর্ণ চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলা যশোর। বিশেষ করে জেলার শার্শা, বেনাপোল ও চৌগাছা সীমান্তকে স্বর্ণ চোরাচালানের ‘সেফ রুট’ হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাচালানিরা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ঢাকা হয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পৌঁছে যাচ্ছে চোরাচালানের স্বর্ণ। মাঝেমধ্যে কিছু স্বর্ণ জব্দ এবং দু-একজন আটক হলেও তারা মূলত বাহক বা শ্রমিক, যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘খ্যাপ’ খাটা জোন বলা হয়।
তবে স্বর্ণের মূল মালিক, ব্যবসায়ী বা মহাজনেরা জটিল কৌশল অবলম্বন করায় বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
বিজিবি দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন (যশোর), বেনাপোল কাস্টমস হাউস ও স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বার্ষিক অপরাধ প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালে বিজিবির যশোর ব্যাটালিয়নের আওতা থেকে ২৭ দশমিক ৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ, ৩৮-৪০ জন চোরাকারবারি বা বাহক আটক, অন্তত ৪০টি মামলা দায়ের ও ১৩ জনের পুরোনো মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।
২০২৪ সালে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারকালে ১৫১ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এ সময় অন্তত ১০০ জন আটক, অর্ধশতাধিক মামলা এবং পুরোনো মামলায় পাঁচ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। ২০২৫ সালে এ সীমান্তে সাড়ে ৬৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ, ৫০ জন আটক, ৪০টি মামলা ও আগের মামলায় ৮-১০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়।
চলতি ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৪ কেজি স্বর্ণ জব্দ, ২৮ জন চোরাকারবারি বা বাহক আটক, ২২টি মামলা দায়ের ও আগের মামলায় আটজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও থামছে না স্বর্ণের এই অবৈধ প্রবাহ। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও অন্যান্য সূত্র আরও জানিয়েছে, যে পরিমাণ স্বর্ণ চোরাচালান হয়, জব্দ হয় তার ছিটেফোঁটা।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে চোরাচালান হওয়া স্বর্ণের সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। সবচেয়ে বেশি আসে দুবাই থেকে। এ তালিকায় আরও আছে ওমান, কাতার ও সৌদি আরব। এর মধ্যে দুবাইকে স্বর্ণ চোরাচালানের ‘ট্রানজিট হাব’ বলা হয়ে থাকে। দুবাই থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বড় বড় চালান বাংলাদেশে পৌঁছায় আকাশপথে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণের বার আসে।
সূত্রমতে, এসব স্বর্ণের বেশির ভাগই দেশে ঢোকে মূলত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। বিভিন্ন উপায়ে আনা স্বর্ণ বিমানকর্মীদের সহায়তায় বিমানবন্দর থেকে বের করে রাজধানীর নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। সেখান থেকে বড় চালানগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে পাঠানো হয় যশোর সীমান্তের সিন্ডিকেটের কাছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় সড়কপথের দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রেলপথ, এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসকেও।
সীমান্ত সিন্ডিকেট সেগুলো যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা, অগ্রভুলোট, পাঁচভুলোট, বেনাপোলের পুটখালী ও দৌলতপুর, চৌগাছা উপজেলার শাহজাদপুর, মাসিলা, কাঠগড়, আন্দুলপোতা ও কাবিলপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এবং উত্তর ২৪ পরগনার এজেন্টদের হাতে পৌঁছে দেয়। সর্বশেষ যারা ভারতের চোরাকারবারিদের হাতে স্বর্ণ তুলে দেন, তারা সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দা। তথ্যমতে, দুবাই থেকে ঢাকা হয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারত—এটিই হলো স্বর্ণ চোরাচালানের প্রধান রুট।
স্বর্ণ ঢাকা থেকে যশোর সীমান্তে পৌঁছাতে তিন-চারবার হাতবদল হয় সংকেত বা পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে। মূলত যে বা যারা ঢাকা থেকে স্বর্ণ আনছে, সে জানে না সীমান্তের ওপারে কাকে বা কাদের এটি দিতে হবে। আবার যে বা যারা সীমান্ত পার করছে, সেও জানে না ঢাকার মূল মালিক কে বা কারা। মাঝপথে দু-একজন ধরা পড়লেও সে আগের বা পরের কারও তথ্য দিতে পারে না। এই জটিল কৌশলের কারণে মূল হোতারা সব সময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ভারতে স্বর্ণের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক থাকায় সেখানে স্বর্ণের দাম মধ্যপ্রাচ্য ও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে সেফ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাচারের হার সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ এই সময়ে ভারতে দীপাবলি ও বিয়ের মৌসুম থাকে, যার ফলে সেখানে স্বর্ণের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ভারতের বিশাল বাজারে স্বর্ণের এই চড়া চাহিদাই চোরাচালানের প্রধান কারণ।
স্বর্ণ আমদানির একটি বৈধ পথ রয়েছে, যেখানে সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু চোরাচালানের মাধ্যমে আসা স্বর্ণের কোনো ট্যাক্স দেওয়া হয় না। এতে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। তা ছাড়া চোরাকারবারিরা যখন বিদেশ থেকে স্বর্ণ কেনে, তখন তারা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে টাকা পাঠায় হুন্ডির মাধ্যমে। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটা বড় অংশ দেশের রিজার্ভে না ঢুকে চলে যায় চোরাকারবারীদের হাতে। যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা তৈরি এবং ডলার সংকটকে আরও প্রকট করে তোলে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যুবক ও কিশোরেরা অল্প সময়ে বেশি টাকার লোভে চোরাচালানের পথে পা বাড়ায়। এতে তারা পড়াশোনা বা বৈধ পেশা ছেড়ে অপরাধ জগতের অংশ হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামোর ক্ষতি করছে। শুধু স্বর্ণ চোরাচালানের বাহকদের ধরলেই এই মহোৎসব বন্ধ হবে না। এর নেপথ্যে থাকা রাঘব-বোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে যশোর সীমান্তকে স্বর্ণ চোরাচালানমুক্ত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব এবং অতিদরিদ্র মানুষকে চোরাচালানে প্রলুব্ধ করা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা জরুরি।
যশোর জুয়েলারি সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর মোশাররফ হোসেন বাবু বলেন, বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির লাইসেন্স আছে ১৭-১৯ জন ব্যবসায়ীর। চোরাচালানিদের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ অবৈধভাবে আসা স্বর্ণের কারণে বাজারে দাম ও জোগানে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ে।
যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, স্বর্ণ চোরাচালান দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। সীমান্তকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধভাবে স্বর্ণ পাচারের চেষ্টা করে, যা প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। আমরা সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছি। আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং টহল আগের চেয়ে অনেক গুণ বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে একের পর এক চালান ধরা পড়ছে। তবে দুর্গম সীমান্ত এলাকা এবং চোরাকারবারিদের নিত্যনতুন জটিল কৌশলের কারণে অনেক সময় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।