বাবার স্বপ্ন ছিল গোলকিপার হওয়া, কিন্তু পারিবারিক দায়িত্বের চাপে তা অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। সেই অপূর্ণতা এখন ঘুচিয়ে দিচ্ছেন সন্তান। ফুটবলার হিসেবে সাফল্যের প্রতিটি মুহূর্তে বাবার সেই হারানো স্বপ্নকে পুনরুজ্জীবিত করছেন পেদ্রি। এটি পেদ্রি ও তাঁর বাবা ফার্নান্দো গঞ্জালেসের এক আবেগঘন গল্প।
বাংলাদেশ সময় গত রবিবার রাতে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ বাঁশি বাজার পর এক অনন্য মুহূর্ত তৈরি হয়। আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। মাঠের ভেতর খেলোয়াড়দের আবেগ উপচে পড়ে; লামিনে ইয়ামালকে কাঁদতে দেখা যায়, আর রদ্রি উদ্যাপন করছিলেন সতীর্থদের সঙ্গে। এই আনন্দঘন মুহূর্তে যখন পরিবারগুলো মাঠে নেমে আসেন, তখন এক বিশেষ দৃশ্য উপহার দেন বার্সেলোনা ও স্পেনের মিডফিল্ডার পেদ্রি।
তিনি তাঁর বাবাকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াতে বলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর পরিবার। বাবা পোস্টে দাঁড়ানোর পর পেদ্রি বলেন, ‘সে সেভ করবে নিশ্চিত। সব সময়ই করে।’
পেদ্রির কথা সত্যি হলো। তাঁর ডান পায়ের ‘পানেনকা’ শটটি নিজের ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন ফার্নান্দেজ। এই দৃশ্য দেখে চারপাশের সবাই করতালিতে ফেটে পড়েন এবং পেদ্রি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন তাঁর বাবাকে।
বাবাকে পোস্টে দাঁড় করিয়ে পেনাল্টি শট নেওয়ার এই দৃশ্যটি এখন পেদ্রির পরিবারের এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। গত মে মাসে বার্সেলোনার লা লিগা জয়ের পর ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার একইভাবে বাবাকে পোস্টে দাঁড় করিয়ে শট নিয়েছিলেন। কখনো কখনো বলের বদলে জার্সি বা বোতল ছুড়ে মারেন তিনি, যা ধরার চেষ্টা করেন তাঁর বাবা। এমনকি গত মে মাসে বার্সার অনুশীলনেও পোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন পেদ্রি। জুলস কুন্দের শট ঠেকিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বন্ধুরা, আমার বাবা ছিলেন গোলকিপার।’
এই বিশেষ সম্পর্কের পেছনে রয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী ইতিহাস। টেনেরিফের বাহামারে জন্ম পেদ্রির। তাঁর বয়স তিন বছর হলে পরিবার নিয়ে পাশের শহর তেগুয়েস্তায় চলে যান ফার্নান্দেজ। পেশাদার গোলকিপার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর, যা আধা পেশাদার ক্লাব তেহিনায় আঞ্চলিক পর্যায়ে খেলেছিলেন। কিন্তু পেশাদার ক্যারিয়ারের দ্বারপ্রান্তে থাকাকালীন পেদ্রির দাদা অর্থাৎ ফার্নান্দেজের বাবার মৃত্যু হয়।
পারিবারিক দায়িত্ব কাঁধে আসায় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হয় ফার্নান্দেজকে। বুট ও গ্লাভস তুলে রেখে তিনি পারিবারিক রেস্টুরেন্ট চালানোর দায়িত্ব নেন। তবে ফুটবলপ্রেম কমেনি তাঁর; বার্সেলোনার অন্ধ ভক্ত ফার্নান্দেজ ২০০৬ সালে বার্সেলোনা-আর্সেনাল চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল দেখতে প্যারিসেও গিয়েছিলেন।
পেদ্রির ফুটবল যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় ক্লাব তেগুয়েস্তা ও লাগুনার বয়সভিত্তিক দলে। এরপর লাস পালমাসের যুব প্রকল্পে যোগ দেন তিনি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে লাস পালমাসের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বার্সায় যোগ দেন পেদ্রি। বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার এবং বার্সার হয়ে তিনবার লিগ জিতেছেন।
নিজের ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে মা-বাবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন পেদ্রি। অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সবখানেই পাশে ছিলেন ফার্নান্দেজ। ২০২৪ ইউরো জয়ের পর প্রথমবার বাবাকে পোস্টের নিচে দাঁড় করান পেদ্রি। এরপর ২০২৫ সালে এবং গত বছর স্প্যানিশ সুপার কাপ জয়ের পর একই কাজ করেন তিনি। গত ১০ মে বার্সার ২৯তম লা লিগা জয়ের পর এই ঐতিহ্য বজায় রাখা হয়।
বিশ্বকাপ ফাইনালে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলটি স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তবে পেদ্রি ও তাঁর বাবার এই আবেগঘন সম্পর্ক স্পেনের জয়কে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।